শীতকাল দোরগোড়ায়; রোগভোগ থেকে কী করে খুদেকে আগলে রাখবেন এই সময়?

শীতকাল দোরগোড়ায়; রোগভোগ থেকে কী করে খুদেকে আগলে রাখবেন এই সময়?

ঐশির বয়স চার বছর তিন মাস। গতবছরেই ওকে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করায় ঈপ্সিতা। প্রথম থেকেই স্কুল যাওয়া নিয়ে ওর কোনও বায়না নেই। আর অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে ওর ভাব জমে গিয়েছে খুব। সেই মেয়েই গত তিন দিন ধরে স্কুল যেতে পারছে না। শীতের হাওয়ায় ঠান্ডা লাগিয়ে তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী। গতকাল ওকে নিয়ে ঈপ্সিতা ওর চিকিৎসকের কাছে যায়। দু’-একটা লক্ষণ দেখেই চিকিৎসক বুঝে গিয়েছিলেন ঐশির কমন কোল্ড অর্থাৎ সাধারণ ঠান্ডা লেগেছে। (Common Winter Diseases & How To Protect Your Child From Them)

তবে চিকিৎসক কোনও ওষুধ লিখলেন না। বরং কয়েকটা ঘরোয়া উপায় বাতলে দিলেন, যাতে ঐশি সুস্থ হয়ে ওঠে। ঈপ্সিতা অবশ্য তারপরেও চিন্তায় ছিল। চিকিৎসক তা বুঝতে পেরে ওকে আরও কয়েকটি রোগের বিষয়ে (List of Winter Illnesses) সাবধান করে দিলেন। শিশুবয়সে এই রোগগুলোয় প্রায়ই আক্রান্ত হয় বাচ্চারা (Illnesses Caused by Cold Weather)। রোগের লক্ষণের পাশপাশি কীভাবে তা সারিয়ে তোলা সম্ভব, তা নিয়েও বললেন চিকিৎসক।

 

শীতকালীন রোগভোগ ও তার থেকে শিশুকে রক্ষা করার উপায়! (Common Winter Diseases And How To Protect Your Child From Them)

#1. ঠান্ডা লেগে জ্বর:

  • লক্ষণ: শীতের হাওয়া দিতে না-দিতেই ওর নাক দিয়ে জল পড়ছে, সঙ্গে হাঁচিও। অনেক সময় হাঁচির পাশাপাশি খুদেকে কাশতেও দেখা যাচ্ছে। হাঁচি, কাশি, নাকবন্ধ ইত্যাদি লক্ষণগুলো দেখলে বুঝতে হবে ওর ঠান্ডা লেগেছে। এই অবস্থায় ওর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের বেশি থাকলে নিশ্চিতভাবেই সেটি জ্বরের লক্ষণ
  • কারণ: ঠান্ডা ও জ্বর হওয়ার পিছনে নানারকম কারণই থাকতে পারে। সাধারণত দেখা যায় আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না ওর ছোট শরীর। তাই ঠান্ডা লেগে জ্বর হয়। এছাড়াও এই জ্বর অনেক সময় সংক্রামক হয়। তাই আশেপাশের কারও থেকেও সংক্রমিত হতে পারে।
  • চিকিৎসা: তিন থেকে দশ বছর বয়সের মধ্যে ৯৯ ভাগ বাচ্চাদেরই ঠান্ডা লেগে জ্বর হওয়ার এই প্রবণতা থাকে। চিকিৎসকরা তাই আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। ঠান্ডা লেগে জ্বর হলে, লক্ষ্য রাখতে হবে ছোট্ট সোনা যাতে প্রচুর পরিমাণে জল খায় ও বিশ্রাম নেয়। অনেক সময় বুকে কফ জমে যায়। সেক্ষেত্রে তুলসীপাতা ও মধু মিশিয়ে (এক বছরের পর) খাওয়ানো যেতে পারে।

 

#2. আলজিভে সংক্রমণ:

  • লক্ষণ: কয়েকদিন ধরেই খুদের শুকনো কাশি হচ্ছে, বলছে গলা খুশখুশ করছে। এমনকী খাবার গিলতেও সমস্যা হচ্ছে ওর। আলজিভে সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে চিকিৎসক এগুলোর কথাই বলে থাকেন। এই সময় খোকাখুকুরা জিভ বার করে হাঁ করলে দেখা যাবে ওর টনসিল বা আলজিভ আকারে বড় হয়ে গিয়েছে।
  • কারণ: চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে থাকা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস নিশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের শরীরে যায় (Diseases Caused by Cold Temperature)। অনেক সময় এদের কারণেই আলজিভে এমন সংক্রমণ হয়। তবে শিশুরা বায়না করে আইসক্রিম বা কোল্ডড্রিংকস জাতীয় ঠান্ডা খাবার খেলেও আলজিভে সংক্রমণ হয়।
  • চিকিৎসা: এই সমস্যার চিকিৎসা অন্যান্য রোগের তুলনায় একেবারেই সহজ। নামমাত্র নুন ঈষৎ উষ্ণ গরম জলে মিশিয়ে খুদেকে গার্গল করতে বলুন। শীতকালে খুদে বায়না করলেও ঠান্ডা খাবার যেমন আইসক্রিম বা কোল্ডড্রিংকস এড়িয়ে চলা উচিত। এছাড়া ওকে গরম জামাও পরিয়ে রাখা দরকার।

 

#3. কানে সংক্রমণ:

  • লক্ষণ: শীতকালে অন্যান্য রোগের মতোই কানে ঠান্ডা লেগে সংক্রমণ হওয়াও একটি সাধারণ ঘটনা। এক্ষেত্রে খুদের কানে প্রচন্ড ব্যথা হতে থাকে, এমনকী জ্বর হতে পারে। বেশিরভাগ সময়েই সে কান নিয়ে তার অস্বস্তি প্রকাশ করে। এছাড়াও ওর ঘুমেও বারবার ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
  • কারণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, ঠান্ডার সময় যথাযথ নিরাপত্তার অভাবেই এই সংক্রমণ হয়। প্রচন্ড ঠান্ডা পড়লেই সাধারণত কানে ঠান্ডা লেগে সংক্রমণ হয়। তবে ব্যাকটেরিয়া থেকে এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
  • চিকিৎসা: চিকিৎসক এই সমস্যায় প্রাথমিকভাবে ব্যথা কমানোর ওষুধ দেন। এছাড়া ইনফেকশন প্রতিরোধের ওষুধও দেন। কানে সংক্রমণ এড়াতে লক্ষ রাখতে হবে স্নানের পর ওর কানে যাতে জল ঢুকে না-যায়।

 

আরও পড়ুন: ঘনঘন ঠান্ডা লাগছে ছোট্ট বাচ্চার? সারিয়ে তোলার রসদ আছে রান্নাঘরেই, জেনে নিন এখনই!

 

#4. পেট খারাপ বা স্টমাক ফ্লু :

  • লক্ষণ: পেট খারাপ শুধু শীতে নয়, সারা বছরই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই রোগে খুদের তীব্র ডায়রিয়ার সমস্যা দেখা দেয় (Common Winter Illnesses in Children)। এছাড়াও জ্বর হতে পারে ছোট্ট খুকুর। এই সময় বাচ্চারা ডিহাইড্রেশনের কারণে দুর্বলও হয়ে যেতে থাকে‌।
  • কারণ: খাবার বা জলের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থাকলে তা খাবারের মাধ্যমে খুদের শরীরে যায়। এছাড়াও হাত না-ধুয়ে খেলেও একই ভাবে রোগটি ছড়ায়। বিশেষজ্ঞদের কথায়, ভাইরাস যতক্ষণ ওর পেটে বা লিভারে রয়েছে ততক্ষণই ও সমস্যায় ভুগবে।
  • চিকিৎসা: এই রোগে বারবার ডায়রিয়া হওয়ায় শরীর ভীষণ ভাবে ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়ে। চিকিৎসক তাই এই সময় প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়াও অবস্থা খুব গুরুতর হলে নির্দিষ্ট ওষুধ খাওয়ারও পরামর্শ দেন। তবে এমন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে বাচ্চার মা-বাবাকেও সমান সতর্ক করেন চিকিৎসক। ও খাবার খাওয়ার আগে হাত ধুয়েছে কি না, খাবার ঠিক ভাবে ঢাকা ছিল কি না— ইত্যাদি বিষয়েও নজর রাখা প্রয়োজন।

 

 

#5. ব্রংকিওলাইটিস:

  • লক্ষণ: ফুসফুসের ভিতরে যে শাখাপ্রশাখাগুলো ছড়িয়ে থাকে তাদের মধ্যে আকারে সবচেয়ে ছোটগুলিকে বলে ব্রংকিওল। এই ছোট ছোট প্রশাখাগুলোতে কোনও কারণে মিউকাস জমলে ফুসফুসে আগের মতো অক্সিজেন প্রবেশ করতে পারে না। এটিই ব্রংকিওলাইটিস। এই সমস্যায় শিশুর নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হয়, মাঝে মাঝে নাক বন্ধ হয়ে যায়।
  • কারণ: শীতকালে ভাইরাস সংক্রমণের থেকেই এটি হয়। বিশেষজ্ঞদের কথায়, সাধারণ ঠান্ডা লাগার তুলনায় এটি অপেক্ষাকৃত গুরুতর সমস্যা। ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে ব্রংকিওলে মিউকাস জমতে থাকে। এতে ফুসফুসে এক নিশ্বাসে যতটা অক্সিজেন প্রবেশ করা উচিত, তা করতে পারে না। ফলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ভাইরাসের এই সংক্রমণ অসুস্থ ব্যক্তি বা দূষিত পরিবেশ থেকে হয়।
  • চিকিৎসা: ধুলো-বালি উড়ছে এমন এলাকায় খুদের নাক-মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এছাড়া এই রোগে অসুস্থ এমন ব্যক্তির কাছাকাছি খুদেকে যেতে দেওয়া একেবারেই উচিত নয়।

 

#6. হাত, পা ও মুখের রোগ:

  • লক্ষণ: খুদের হাত, পা ও মুখের নানা অংশে লাল লাল ছোপের মতো সৃষ্টি হয়েছে। সেই অংশগুলোতে ক্রমাগত ব্যথাও হয়। এটিই এই রোগের সবচেয়ে বড় লক্ষণ। এই ছোপের পরিমাণ বাড়লে শিশুর খাওয়াদাওয়ার ইচ্ছেও কমে যায়। এমনকী জল খেতেও চায় না।
  • কারণ: এই রোগ মূলত সংক্রমণের মাধ্যমেই ছড়ায়। ছোট্ট খুদে যখন স্কুলে যাচ্ছে, তখন সে আর পাঁচটা বাচ্চার সঙ্গে মেলামেশা করছে। ফলে আশেপাশের পরিবেশ থেকে সংক্রামিত হওয়া স্বাভাবিক। তবে শীতকালেই এর প্রাদুর্ভাব হয়।
  • চিকিৎসা: এই রোগে ভরসা একমাত্র চিকিৎসকই। খুকুকে সারিয়ে তুলতে এই সময় চিকিৎসকরা কিছু ওষুধের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি বাবা-মাকেও সতর্ক করে দেন। যেহেতু এটি সংক্রমণের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই লক্ষ রাখা প্রয়োজন ওর চারপাশের পরিবেশের উপরেও।

 

চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পর ঈপ্সিতার সংশয় অনেকটাই কেটেছে। ও মনে মনে ঠিকও করেছে, এবার থেকে এসব বিষয়ে খুব সতর্ক থাকবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতোই ঐশিকে যত্ন করায় তিন দিনের ভিতরেই ও সুস্থ হয়ে ওঠে। ছোট্ট ঐশি তখন আবার তার আগের ফর্মে। এতদিন পর বিছানা ছেড়ে উঠেছে। তখন ওর দুষ্টুমি আর দেখে কে? (Common Winter Diseases And How To Protect Your Child From Them)

 

আরও পড়ুন: ছোট্ট শিশুকে সর্দির হাত থেকে বাঁচাতে বাড়িতেই বানান চ্যবনপ্রাশ ও কফ সিরাপ, পদ্ধতি রইল এখানে!

 

একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

 

null

null