বাচ্চাদের জন্য ভিটামিন ডি কেন প্রয়োজন?

বাচ্চাদের জন্য ভিটামিন ডি কেন প্রয়োজন?

আজকাল অনেকের কাছেই ভিটামিন ডি নিয়ে আলোচনা শোনা যায়, বাচ্চা থেকে শুরু করে দাদু- ঠাকুমাদের কাছেও এর প্রয়োজনীয়তা কতটা এবং কেন; সবাই যেন স্বাস্থ্যের ওপর ভিটামিন ডি-র উপকারিতা নিয়ে বড্ড বেশি সচেতন হয়ে পড়েছে।   আর হবে নাই বা কেন? সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, বাচ্চাদের মধ্যে প্রায় ৭৭%-র শরীরে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি রয়েছে । আরও দেখা গিয়েছে, যেসব বাচ্চারা শুধুমাত্র বুকের দুধের ওপর নির্ভরশীল, তাদের শরীরেও ভিটামিন ডি-র ঘাটতি হয়ে থাকে। সাধারণত, একদম ছোট বাচ্চাদের পুরোপুরিভাবে কাপড়ে মুড়ে রাখা হয় এবং তারা যথেষ্ট সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসে না; যা পরোক্ষ ভাবে তাদের শরীরে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি সৃষ্টি করে। মা যখন ভিটামিন ডি-র অভাবে ভোগে, তা বাচ্চার শরীরেও দেখা দেয়। জন্মের ৬-৮ সপ্তাহের মধ্যে আপনার বাচ্চার শরীরে ভিটামিন ডি-র পরিমাণ নির্ধারিত হয়ে যায়; যা মায়ের শরীরে থাকা ভিটামিন ডি- র ওপর নির্ভর করে। এছাড়াও, বুকের দুধে বাচ্চার বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকায়, শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চারা ভিটামিন ডি-র অভাবে ভোগে। এজন্যই ডাক্তাররা এইসব বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চাদের জন্য মাল্টিভিটামিন ড্রপ (multivitamin drops) খাওয়াতে বলেন। বাজারে বিক্রি হওয়া নামীদামি কোম্পানির বাচ্চাদের খাবারে যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকে, তার ব্যাপারে সরকারী আইন মেনে চলতে হয় বলে, প্যাকেটজাত খাবার খাওয়া বাচ্চারা এরকম কোনও সমস্যার সম্মুখীন হয় না। ।

বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চারা কীভাবে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পেতে পারে? (How can breastfed babies get adequate amount of Vitamin D?)

যদি আপনি পুরানো ঐতিহ্য মেনে চলেন, তা হলে আপনি লাভবানই হবেন! ভারতবর্ষে, বহু আগে থেকেই বাচ্চাদের তেল মালিশ করে রোদে শুইয়ে রাখার পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সামান্য কাপড় গায়ে দিয়ে বাচ্চাদের রোদে আধঘণ্টা মতো শুইয়ে রাখা হয়। আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবে ভিটামিন ডি সংশ্লেষণ করতে সক্ষম। বাচ্চাদের যখন রোদে রাখা হয়, এটা দু’রকম ভাবে কাজ করে। প্রথমত, তাদের শরীরে প্রাকৃতিক উপায়ে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, আর দ্বিতীয়ত, সূর্যরশ্মির নিজের  জীবাণুনাশক ক্ষমতা বাচ্চাদের শরীরের গোপন অঙ্গগুলোর জন্য খুব লাভদায়ক হয়।

বাচ্চাদের ভিটামিন ডি কেন প্রয়োজন হয়? (Why do babies need Vitamin D?)

  • ভিটামিন ডি–র প্রধান কাজ, বাচ্চার শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম শোষণ এবং হাড় তৈরি ও মজবুত করতে সাহায্য করা।
  • ভিটামিন ডি–র অভাবে রিকেট রোগ হয় এবং মাংসপেশী সুগঠিত হয় না।
  • বাচ্চার শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ কম হলে, বাচ্চা হাইপোক্যালসেমিয়া (hypocalcemia) এবং খিঁচুনি রোগে (seizures) ভুগতে পারে।
  • ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রধানত তার খাবারে ক্যালসিয়াম কম থাকা ভিটামিন ডি–র ঘাটতির অন্যতম কারণ এবং এর কারণে হাঁটু আটকে যাওয়া, পা বেঁকে যাওয়া এবং রিকেট হতে পারে।

ভিটামিন ডি-র ঘাটতির লক্ষণ (Signs of low Vitamin D)

বাচ্চা যে ভিটামিন ডি-র অভাবে ভুগছে, তা নীচে উল্লিখিত উপসর্গগুলো থেকে বুঝতে পারবেনঃ
  • মাথায় অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।
  • সঠিক বৃদ্ধি না হওয়া।
  • মাংসপেশী সুদৃঢ়ভাবে তৈরি না হওয়া।
  • ফনটানেলেস (Fontanelles) বন্ধ না হওয়া।
  • মাথা বড় হয়ে যাওয়া এবং বড় হয়ে যাওয়া পেট।

আপনার বাচ্চার কতটা ভিটামিন ডি প্রয়োজন? (How much Vitamin D does your child need?)

  • ১ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চাদের প্রত্যেক দিন ৪০০ আইইউ (ইন্টারন্য়াশনাল ইউনিট) আর এক বছরের বেশি বয়সের বাচ্চাদের দিনে ৬০০ আইইউ ভিটামিন ডি প্রয়োজন হয়।
  • ইউ এস এন্ডক্রিন কমিটি (U.S Endocrine Committee) অনুযায়ী, এক বছরের কমবয়সি বাচ্চার ক্ষেত্রে দিনে ৪০০-৬০০ আইইউ এবং ১ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত দিনে ৬০০-১০০০ আইইউ ভিটামিন ডি প্রয়োজন হয়।
  • যেসব বাচ্চারা অন্যান্য ওষুধ যেমন অ্যান্টিকনভালসানটস (anticonvulsants) খেয়ে থাকে খিঁচুনি রোগ সারানোর জন্য, অ্যান্টিফাঙ্গাল (antifungal) ওষুধ বা এইডসের জন্য ওষুধ খায়;  তাদের ভিটামিন ডি-র প্রয়োজন বেশি হয়।

বাচ্চার শরীরে ভিটামিন ডি যেভাবে বাড়াতে পারেন (Ways to increase your child’s Vitamin D intake)

  • ভিটামিন ডি-র সবথেকে ভালো উৎস হল সূর্যের আলো। আপনার বাচ্চা এর থেকে যেমন পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাবে, সেরকমই তাজা বাতাসও নিতে পারবে। সকালবেলার সূর্যের রোদ সবথেকে উপকারী হয়।
  • কিছু কিছু খাবারও আপনার বাচ্চার শরীরে ভিটামিন ডি-র পরিমাণ বাড়াতে পারে। স্যালমন, কড লিভার অয়েল, অরগ্যান মিট (organ meats) এবং ফরটিফায়েড ফুড (fortified foods) যেমন দুধ, চিজ এগুলো ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ।
  • আপনি ভিটামিন ডি-র জন্য বাচ্চাকে সাপ্লিমেনটও খাওয়াতে পারেন। ভিটামিন ডি-থ্রি, ওরাল ড্রপ হিসেবে ৪০০ আইইউ, সিরাপ হিসেবে ৪০০ আইইউ এবং ট্যাবলেট হিসেবে ১০০০ এবং ২০০০ আইইউ, ব্লিসটার প্যাকিং এবং স্যাশেতেও এটা পাওয়া যায়। পাউডার হিসেবে নিলে প্রত্যেক স্যাশেতে ৬০,০০০ আইইউ ভিটামিন ডি-থ্রি থাকে। বাচ্চাকে সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার আগে অবশ্যই বাচ্চার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।        
  • রেগুলার ভিটামিন ডি-থ্রি ড্রপ ছাড়াও ইনজেকশন এবং স্যাশে পাওয়া যায়। আপনার ডাক্তার বললে শুধুমাত্র তখনই এইসব সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করুন।
  • হোমিওপ্যাথিতেও কিছু ওষুধ আছে, যা বাচ্চার শরীরে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি কমাতে সাহায্য করে। সাইলেসিয়া (Silicea), ক্যাল্কেরিয়া কার্ব (Calcarea carb), ক্যাল্কেরিয়া ফস (Calcarea Phos); কিছু পরিচিত ওষুধ যেগুলো হোমিওপ্যাথি ডাক্তাররা দিয়ে থাকেন।  
সেজন্য, প্রিয় মায়েরা, যদি বাচ্চার মধ্যে এরকম কোনও উপসর্গ দেখেন,  সবার আগে একজন ডাক্তারকে দেখিয়ে নিন। নিজে নিজে কোনও ওষুধ আপনার বাচ্চাকে দেবেন না, কারণ আপনি হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ দিয়ে দিতে পারেন। ডাক্তারের নির্দেশমতোই বাচ্চাকে ওষুধ খাওয়ান। একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

null

null