শিশুর বিকাশে মাতৃভাষা

শিশুর বিকাশে মাতৃভাষা

একে অপরের সঙ্গে যোগযোগের প্রধান সূত্রটাই হলো ভাষা। আর সেই ভাষা যখন আপন হয় তখন? ঠিকই ধরেছেন, মাতৃভাষার কথাই বলছি আমরা। মায়ের কাছে যেমন সব আবদার, সব আহ্লাদ চলে। মাতৃভাষাও ঠিক তেমন ভাবেই আগলে রাখে আমাদের। সে যতই যাই হোক, রাগ-দুঃখ-অভিমান-ক্ষোভ-আনন্দ-উচ্ছ্বাস-ভালোবাসার প্রকাশ, সবেতেই এখনও বাঙলা ভাষাটাকেই আঁকড়ে ধরি আমরা। যুগের কারণে বিদেশি ভাষার শিক্ষা এখন আবশ্য়ক। কিন্তু তা বলে কি বাংলাটাই ভুলে যাবো আমরা? না, কখনও না। মাতৃভাষার হাতটা আজও ছাড়িনি আমরা, ছাড়তে দেবো না আগামীর প্রতিনিধিদেরও। কচিকাঁচাদের মধ্য়ে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ তৈরি করার দায়িত্বটা কিন্তু আমাদেরই। শুধুই যে ভাষা রক্ষার তাগিদ, তা নয়। মাতৃভাষার শিক্ষাই কিন্তু ওর সার্বিক বিকাশে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। চলুন, দেখে নেওয়া যাক কীভাবে! (Role of mother tongue in child development in Bengali)

শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘আমাদের এই শিক্ষার সহিত জীবনের সামঞ্জস্য় সাধনই এখনকার দিনের সর্বপ্রধান বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কিন্তু এ মিলন কে সাধন করিতে পারে? বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য়।’ সেই সূত্র ধরে বলছি, বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য়ের প্রতি আপনার বাচ্চার মনে আর্কষণ তৈরি করুন। কেননা, ‘শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধসম’।

Role of mother tongue in child development in Bengali 

#1. মাতৃভাষা আত্মপ্রকাশের মাধ্যম (Way to express yourself)

নিজের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চেয়ে আপন আর কেউ হতেই পারে না। শিশুর কাছে তার আশপাশের সব কিছুই বড্ড অচেনা, বড্ড ভয়ের। যে ভাষাটি প্রথম শেখে ও, তা দিয়েই অচেনা সব কিছু নিয়ে মনে মনে একটা ধারণা তৈরি করে নেয়। মাতৃভাষাই ওর চিন্তন আর মননের বিকাশ ঘটায়। তা বাদে মাতৃভাষাই আপনার বাচ্চার মনের ভাব প্রকাশে সাহায্য় করে। শুধু তাই নয়, বাইরের কোনও ভাব বা ধারণা আত্মস্থ করারও সবচেয়ে সহজ মাধ্য়ম হল নিজের ভাষা বা মাতৃভাষা।

#2. সার্বিক বিকাশে সহায়ক (Helps in overall growth)

মাতৃভাষার শিক্ষা যে কোনও শিশুরই সার্বিক বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভাষায় সাবলীল ভাবে কথা বলতে পারাটাই বাচ্চার অনেক সমস্য়াই সমাধান করে দেয়। শিশু তার শিকড় চিনতে পারে, নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। এতে ওর জ্ঞান বৃদ্ধি হয়। সেই সঙ্গে অন্য় ভাষা শেখার প্রক্রিয়াও সহজ হয়ে যায়। ছোটবেলায় কাকা-জেঠুরা বলতেন, ‘বাংলাটা ভালো না জানলে ইংলিশটা শিখবি কী করে?’ তখন বুঝিনি। এখন বুঝি, কেননা সমীক্ষাও সেটাই বলছে। মাতৃভাষাই অন্য় ভাষার ভিত হয়ে উঠতে পারে আপনার শিশুর জন্য়।

#3. বুদ্ধির বিকাশে সহায়ক (Helps in intellectual development)

মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণেই বুদ্ধির ধারাবাহিক বিকাশ হতে থাকে, সেই সঙ্গে সাবলীলও হতে থাকে আপনার শিশু। মাতৃভাষাই ওর ব্য়ক্তিত্ব গঠনে অন্য়তম ভূমিকা গ্রহণ করে। জন্মের আগে থেকেই যে শব্দগুলো ওর চেনা, যে ভাষা ওর জানা, সে যে ওর চিন্তাশক্তির স্বাভাবিক বিকাশ ঘটাবে, এতে আর ধন্দ কী! শেষ নয় এখানেই। গবেষণা বলছে, অঙ্গ বা সমীকরণের ধাঁধা বাচ্চাদের কাছে অনেক সহজ হয়ে যায়, যখন তা বোঝানো হয় তার মাতৃভাষায়।

#4. প্রতিভার বিকাশ ঘটায় (Talent develops)

যুগের তালে একটা-দুটো ভাষা শিক্ষাতেও ইঁদুর দৌড়ে টিকে থাকা যায় না এখন। শিখে রাখা দরকার আরও আরও বিদেশি ভাষা। কিন্তু গবেষণা কী বলছে জানেন, জন্মের পর শিশু প্রথম যে ভাষাটা শেখে, সেটা তার মস্তিষ্কের ভিতের কোনও না কোনও জায়গায় থেকেই যায়। সে হয়তো বড় হয়ে বাংলা বলবেই না আর, কিন্তু ভাষাটা যে সে ভুলবে না, এ কথা হলফ করে বলা যায়। জীবনের কোনও ক্ষণে দরকারে, অদরকারে মাতৃভাষাই ভোরের আলোর মতো ওর লুকিয়ে থাকা প্রতিভা খুঁচিয়ে জাগিয়ে দেবে। ওর প্রতিভা পূর্ণতা পাবে।

#5.চেতনা ও সৃজনীশক্তির বিকাশ করে (Develops consciousness and creative power)

গর্ভস্থ শিশু চেনে তার মাকে, তার বাবাকে। আর চেনে মাতৃভাষাকে। মা-বাবা যে ভাষায় কথা বলে, সেটাই তার কাছে ভাবপ্রকাশের অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। এমনকী বিজ্ঞান বলে, গর্ভস্থ অবস্থাতেই তার ভাথাকবে ওর মাতৃভাষা। সাহিত্য় সৃষ্টিতে কিংবা বিজ্ঞান চিন্তার মৌলিকতায় মাতৃভাষাই হয়ে থাকবে ওর আঁকড়ে থাকার একমাত্র অবলম্বন। মাতৃভাষায় শিক্ষা ওর মধ্য়ে উন্নত রুচিবোধ, জাতীয় ঐতিহ্য়, সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহও তৈরি করবে। দেশের ঐতিহ্য়, সংস্কৃতির ঐতিহ্য়র প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হবে ওর মনে। পরিবার, বন্ধু সবার সঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকার সূত্র তৈরি হয়ে যাবে ছোট থেকেই।

কিন্তু মাতৃভাষায় শিক্ষা যদি এতই ভালো, তা হলে চারদিকে ইংরেজি মাধ্য়ম স্কুলের এত রমরমা কেন? একের পর এক বাংলা মাধ্য়ম স্কুল বন্ধ হচ্ছে কেন? কেনই বা বাঙালি কচিকাঁচারা বাংলাটাই ভুলে যাচ্ছে এখন? (Growing preference of English-medium schools over their Bengali-medium alternatives among parents)

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই বলি, কিছু বছর আগে পর্যন্তও স্কুল-মানচিত্রটা কিন্তু এমন ছিল নাা। ইংরেজি মাধ্য়ম স্কুল ছিল হাতেগোনা। ছাপোষা ঘরের অধিকাংশ মা-বাবাই তাঁদের ছেলেমেয়ের জন্য় বেছে নিতেন বাংলা মাধ্য়মকে। অথচ কয়েক বছরের মধ্য়েই সব কিছু কেমন দুম করে পাল্টে গেল। একদিকে রাশি রাশি ইংরেজি মাধ্য়ম স্কুল তৈরি হচ্ছে। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্ধ হচ্ছে বাংলা স্কুলগুলো। কিন্তু এই অস্তিত্ব সঙ্কটের কারণটা ঠিক কী? কারণ আর কিছুই নয়। কারণ হলো ইংরেজি শিক্ষার বাধ্য়বাধকতা। আপনার শিশু বিদেশি এই ভাষাটি রপ্ত না করতে পারলে সে যে পিছিয়ে পড়বে লড়াইয়ে। কোন মা-বাবা সেটা চায় বলুন তো?

তা হলে কি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই ভেসে যাবো? না বাংলা আঁকড়ে থাকার চেষ্টাটা চালিয়ে যাবো আজও? সত্য়ি বলতে কী, বাংলা জানতে গিয়ে ইংরেজি জানবো না, আর ইংরেজি জানি বলে বাংলা বলবো না, এই সমীকরণটা তৈরি করেছি আমরাই। দুটো ভাষারই সংস্কৃতি আছে। সে সংস্কৃতি জানা প্রয়োজন। বাংলা ভাষাটা ফেলনা নয়। আবার বাংলা নিয়ে অহমিকার জন্য় ইংরেজি শিখব না, এটা বলাও মূর্খামি। শিক্ষা মানে তো শুধুই একটা চাকরি জোটানোর জন্য় তৈরি হওয়া নয়। ভালো করে ভাবনা-চিন্তা করতে শিখলে, একটা কেন অনেক চাকরির দরজাই খুলে যাবে।

পরের পর বাংলা মাধ্য়ম স্কুল বন্ধ করে দেওয়াটা সহজ। বাংলা মাধ্য়মে পড়েও ইংরেজি শিখে সুশিক্ষিত হওয়া যায়, এই বিশ্বাস গড়ে তোলা কঠিন। আর এই কঠিন কাজটাই করতে হবে আমাদের। আর সেটা না পারলে শিশু শিক্ষাই ব্য়র্থ হবে!

একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

null

null