বাচ্চার সর্দি-কাশির ভয়? আর নয়!

বাচ্চার সর্দি-কাশির ভয়? আর নয়!

সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়ানো দস্যিটা যদি সর্দি-জ্বরের চোখরাঙানিতে কাবু হয়ে পড়ে বা হামা দিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছটফটে পুঁচকিটা যদি সারাদিন নাকের জলে, চোখের জলে অস্থির হয়ে যায়, কোন মা বাবার ভালো লাগে বলুন তো? আর যদি আপনার বাচ্চা পিঠে বোঝা টেনে স্কুলে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে, তা হলে তার স্কুল বন্ধ, খেলাও বন্ধ। যেসব বাড়িতে বাচ্চা রয়েছে, এইসব দৃশ্যগুলো বড্ড পরিচিত বাড়ির অন্য সদস্যদের কাছে। আর বাড়ির বাচ্চার শরীর খারাপ মানে, যেন বাড়িটার ইট-পাথরেরও শরীর খারাপ হয়। বাচ্চাকে যত জলদি সম্ভব সুস্থ করে তুলে, বাড়ির এবং সর্বোপরি নিজেদের ধড়ে প্রাণ আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন বাবা মায়েরা। ডাক্তারের কাছে ছোটেন বা অ্যান্টিবায়টিক ওষুধ কিনে আনেন দোকান থেকে। আর আজকাল পরিবেশ দূষণের কারণেই হোক বা ঋতু বদলের খেয়ালিপনাই হোক, বাচ্চারা খুব সহজেই সর্দি কাশিতে জব্দ হয়ে পড়ে। কিন্তু জানেন কি, আপনার বাড়ির রান্নাঘরেই এমন কিছু উপাদান আছে, যা বাচ্চাকে এই ঠান্ডা লাগার হাত থেকে বাঁচাতে পারে? Natural ingredients to keep your baby away from cold and cough in Bengali.

Natural ingredients to keep your baby away from cold and cough in Bengali  

#1. একেবারেই ছোট শিশু বা দুধের বাচ্চাদের জন্য (For infants)

তেল মালিশ (Oil massage) এক কাপ সরিষার তেলে দুই কোয়া রসুন ও অল্প কালো জিরে দিয়ে গরম করুন। এবার এই তেল বাচ্চার বুকে, পিঠে, পায়ের তলায়, হাতের তালুতে ভালো করে মালিশ করে দিন। বাচ্চার গায়ে তেল মালিশ করার আগে নিজের কনুইয়ে ওই তেল লাগিয়ে উষ্ণতা দেখে নিন। হলুদের পেস্ট (Turmeric paste) যদি মনে হয়, বাচ্চার অল্প ঠান্ডা লেগে গেছে, তা হলে সেটা আর বাড়তে দেবেন না। ঈষদুষ্ণ গরম জলে হলুদ মিশিয়ে পাতলা পেস্ট তৈরি করে নিন। এবার ওই হলুদ পেস্ট বাচ্চার বুকে, কপালে ও পায়ের চেটোতে লেপে দিন। কিছু সময় পরে মুছে দিন। হলুদ শরীর গরম করে এবং শরীরে সর্দি বা শ্লেষ্মা জমে গেলে সেটা গলিয়ে বার করে দেয়।
বুকের দুধ (Breast milk) যেসব বাচ্চারা বুকের দুধ খায় বা ৬ মাসের কম বয়স, তাদের জন্য সবরকম শারীরিক পরিস্থিতিতে মায়ের দুধই শ্রেষ্ঠ। মায়ের দুধ অনেকরকম রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে। তাই ৬ মাস কম বয়সি শিশু যেন মায়ের দুধই খায় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

#2. ২ বছরের বেশি বয়সি বাচ্চার জন্য (For babies above 2 years)

হলুদ দেওয়া দুধ (Milk and turmeric) হলুদ ভীষণ ভালো জীবাণুনাশক উপাদান হিসেবে কাজ করে এবং সর্দি-কাশিতে খুবই কার্যকরী। সর্দি কমাতে তো বটেই, ঠান্ডা লাগার ধাত কমাতেও হলুদ সাহায্য করে। বাচ্চা যদি গ্লাসে করে দুধ খেতে পারে, তা হলে তাকে এক গ্লাস ঈষদুষ্ণ দুধের সাথে আধ চামচ হলুদগুঁড়ো মিশিয়ে খাওয়ান। পুরো শীতকালটাই এই হলুদ দেওয়া দুধ আপনি বাচ্চাকে খাওয়াতে পারেন। তুলসীপাতা, আদা ও মধু (Basil leaves, ginger and honey) সর্দি-কাশি নিরাময়ে এই তিনটি জিনিসের গুরুত্ব জানেন না, এমন মানুষ মনে হয় খুব কমই আছেন। আমাদের মা-দিদিমারা সারাটা শীতকাল এই টোটকা কাজে লাগিয়ে বাড়ির বাচ্চাদের সহজে অসুস্থ হতে দিতেন না। আপনার বাচ্চা যদি চিবোতে পারে, তা হলে আদা ও তুলসীপাতা হামানদিস্তায় অল্প থেঁতো করে নিন, এবার এর সাথে পরিমাণমতো মধু মিশিয়ে বাচ্চাকে প্রত্যেকদিন সকালে খাওয়ান। আদা, গোলমরিচ,তেজপাতা, দারচিনি দিয়ে চা ( Ginger, pepper, bay leaves and cinnamon concoction) না, ভয় পাবেন না। এই মিশ্রণে চা মেশানোর কোনও প্রয়োজন নেই। তবে বাচ্চাকে বলতেই পারেন আপনি ওর জন্য ঝাল ঝাল চা বানিয়ে এনেছেন। বড়রা যেমনভাবে কাপে চা খায়, সেভাবে ওকেও দিন। এতে বড়দের অনুকরণ করে বাচ্চা চা ভেবেই মিশ্রণটি খাবে। এক কাপ জলে আদা কুচি, গোলমরিচ গুঁড়ো, তেজপাতা ও অল্প দারচিনি দিয়ে ভালো করে ফোটান। তারপর মিশ্রণটা ছেঁকে নিন। সামান্য ঠান্ডা হয়ে গেলে মধু মিশিয়ে বাচ্চাকে দিন। মিশ্রণ যেন খুব বেশি গরম না হয় বা বাচ্চা খেতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। বাড়িতে তৈরি করুন চ্যবনপ্রাশ (Homemade chawanprash) খুব সহজেই বাড়িতে বানিয়ে নিতে পারেন এই চ্যবনপ্রাশ। চ্যবনপ্রাশ শরীর গরম করে, তাই শীতকালে প্রত্যেকদিনই বাচ্চাকে এই চ্যবনপ্রাশ খাওয়াতে পারেন উপকরণ (Ingredients) 
  • আমলকি- ১/২ কিলো
  • এলাচ- ৬ টা
  • গোলমরিচ- দেড় টেবিল চামচ
  • দারচিনির টুকরো- ১ ইঞ্চি লম্বা
  • গোটা জিরে- ১ টেবিল চামচ
  • মৌরি- ১ টেবিল চামচ
  • চার মগজ -১/২
  • লবঙ্গ- ৮/৯ টা
  • গোটা গোলমরিচ- ৯/১০ টা
  • গুড়- এক বা দেড় কাপ
  • ঘি – ৫/৬ চামচ
  • মধু- প্রয়োজনমতো
পদ্ধতি (Method)
  • প্রথমে আমলকিগুলো ভালো করে ধুয়ে নিয়ে প্রেসার কুকারে একটা সিটি দিয়ে সেদ্ধ করে নিন। ঠান্ডা হয়ে গেলে বীজগুলো ছাড়িয়ে একটু চটকে মেখে রাখুন।
  • সমস্ত শুকনো মশলা ব্লেন্ডারে গুঁড়ো করে নিন।
  • তলা মোটা হবে এরকম একটা পাত্র নিয়ে তাতে ঘি দিন। ঘি গরম হয়ে ছড়িয়ে গেলে, আমলকি সেদ্ধ দিয়ে নাড়তে থাকুন।
  • যখন দেখবেন পাশ থেকে তেল ছাড়তে শুরু করেছে, তখন গুঁড়ো মশলার মিশ্রণটা দিয়ে দিন।
  • বেশ ভালোভাবে কষানো হয়ে গেলে তাতে এক/দের কাপ গুড় দিয়ে আরও একটু রান্না করুন।
  • বেশ ঘন হয়ে এলে গ্যাস বন্ধ করে ঠান্ডা হতে দিন। ঠান্ডা হয়ে গেলে এতে ইচ্ছে হলে মধু মিশিয়ে নিন এবং একটি পরিষ্কার, শুকনো, এয়ারটাইট কৌটোতে ঢেলে রাখুন।
  • অনেকদিন ভালো রাখতে রেফ্রিজারেটরে রেখে দিন।

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার (Foods rich in Vitamin C)

যেসব ফল বা সব্জিতে ভিটামিন সি আছে, সেগুলো খেলে সর্দি হওয়ার ধাত অনেকটাই কমে যায়। বাচ্চাকে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল যেমন কমলালেবু খাওয়ান।

#3. যা মনে রাখতে ভুলবেন না (Do not forget)

  • বাচ্চার বয়স অনুযায়ী ঘরোয়া পদ্ধতির প্রয়োগ করুন।
  • বাচ্চা যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খায় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।
  • খাবার আগে বা বাইরে থেকে এসে জীবাণুনাশক সাবান বা লিকুইড সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যেসকরান। বাইরে থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত মুছিয়ে দিন।
  • বাচ্চা হাঁচলে বা কাশলে যেন মুখে রুমাল চাপা দেয়, সেই সুঅভ্যাস গড়ে তুলুন।
  • ঘরোয়া পদ্ধতিতে কাজ না হলে বা নির্দিষ্ট সময় পরেও সর্দি-কাশি না কমলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

null

null