ছোট থেকেই শুরু হোক নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা, জেনে নিন কৌশল

ছোট থেকেই শুরু হোক নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা, জেনে নিন কৌশল

“তোকে থামতে বলছি তো? থাম, থাম, রাখ রাখ!”

একরাশ উদ্বেগ নিয়ে ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছেন মা। দামি ফোনটা হাতে সামনে ভেল্কি দেখাচ্ছে একরত্তি মেয়ে! ধমক-ধামক, শাস্তি-পিটুনি; কোনও কিছুতেই ডরায় না সদ্য পাপড়ি মেলা ছোট্ট কুঁড়িটি। বিশ্বজগত মুঠোয় পুড়ে দেখার সে কী প্রবল আকাঙ্ক্ষা তার! Parenting tips for Toddlers in Bangla.

হ্যাঁ, আকাঙ্ক্ষাই বটে। আর এটাই আমরা বড়রা জেদ, মেজাজ বলে ভুল করি। আচ্ছা, কখনও ভেবে দেখেছেন ওইটুকু প্রাণের এত অনুভূতি আসবেটা কোথা থেকে? সবে দৌড়তে, লাফাতে, নিজে হাতে খেতে, গোটা গোটা বাক্য বলতে শিখেছে বাড়ির সবচেয়ে খুদে সদস্যটি। ও দুষ্টুমি করবে না তো কি আমরা করব? তাই বলি, দুষ্টুমি করতে দিন। সঙ্গে সঙ্গে ভুল করলে সেটাও আপনি ধরিয়ে দিন। তবে ধমক-ধামক দিয়ে নয়, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে। আপনার মনে হতেই পারে বাইরে থেকে জ্ঞান দিচ্ছি আমরা, পাজির হদ্দ বাচ্চা সামলানোর কোনও অভিজ্ঞতাই নেই আমাদের! আপনার অবস্থা না বুঝেই গুচ্ছের পরামর্শ দিচ্ছি!
না, তা কিন্তু নয়! কোনও নির্দিষ্ট বাচ্চার প্রেক্ষিতে কথাই বলছি না আমরা। বাড়ন্ত বাচ্চাদের স্বাভাবিক প্রবণতা ঘেঁটেই একটা উপসংহারে আসার চেষ্টা করছি। ধৈর্য ধরে একবারটি পড়ে দেখুন, আশা করি কাজে লাগবে!

শিশুর শৃঙ্খলা শিক্ষার কিছু কৌশল/ What Is The Best Way To Discipline My Child?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর শৃঙ্খলাবোধ বা নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা শুরু হয়ে যাওয়া উচিত সেই কচি বয়স থেকেই! মোটামুটি বছর দুয়েকের হলেই সন্তানকে নানাভাবে ভালো-মন্দর পাঠ দেওয়া শুরু করুন আপনি। আমরা জানি, এই বয়সে শিশুকে নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোর মতো কঠিন কাজ খুব কমই আছে। হয়তো সে কারণেই ‘টেরিবল টুজ’ (terrible twos) কথাটা মা-বাবার কাছে রীতিমতো আতঙ্কের একটা নাম! বছর দুয়ের পুঁচকেগুলো যতই মজার, যতই মিষ্টি হোক না কেন, কখনও সখনও ওদের জেদ-মেজাজ দেখলে অবাক হবেন আপনিও।

আরও পড়ুন: মোবাইল ফোন খেলনা নয়; দূরে রাখুন বাচ্চাকে!

এই বয়সি বাচ্চারা এক একটা ছোট্ট পাওয়ার হাউস যেন! ওই অতটুকু একটা মানুষ, তাও কত্ত এনার্জি, কত্ত উত্তেজনা। দিনভর লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি, চিৎকার করে একাই মাতিয়ে রাখে পুরো বাড়িটা। এত উত্তেজনার কারণ হল, এই সময়টায় খুব অল্পতেই অনেক বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে আপনার ছানা। তখন ওরা না পারে কোনও কাজে মন দিতে, না পারে সেটা ঠিক মতো করে উঠতে। যার জেরেই খাওয়া, খেলা, ঘুম সবেতেই গণ্ডগোল পেকে যায়।
আর একটা বিষয় হল, বেড়ে ওঠার এই দিনগুলোয় শিশুর ইন্দ্রিয় থাকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। কিন্তু ইন্দ্রিয় সক্রিয় থাকলে কী হবে, শরীর যে তার সাথে তাল মেলাতে তখনও তৈরি হয়নি পুরোপুরি! যার কারণেই হাত থেকে দুমদাম জিনিস পড়ে যায়, খাবারের থালা উল্টে যায়, চেয়ারে বসতে গিয়ে পাল্টি খায়, আরও কত কী! আর আমরা ভাবি, ইচ্ছে করে বেটা দুষ্টুমি করছে।

জোর গলায় ‘না’ বলাটাও এসময় বাচ্চার কাছে খুবই প্রিয় শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা ভাবি, জেদ করছে ও! আদতে কিন্তু তা নয়, ‘না’-এর মাধ্যমেই ওরা ওদের ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটাতে চায়। বোঝাতে চায়, আমি স্বতন্ত্র মানুষ, আমারও একটা মত আছে বই কি! এই ‘না’ বলার প্রবণতাই অনেক সময় মিথ্যে বলতেও অনুপ্রেরণা জোগায় ওকে।

এসব দেখে-শুনে আপনার ঘাবড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাও বলছি আশ্বস্ত হোন, আপনার ছেলে/মেয়ে হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে না! বয়সমাফিক এটাই ওদের স্বাভাবিক আচরণ। আপনি বরং একটু সচেতন হোন, ওদের বেড়ে ওঠার সাথে মানানসই ভাবে নিয়ম-শৃঙ্খলার পাঠ দেওয়ার চেষ্টা করুন ওকে। নীচে তেমনই কিছু কৌশলের হদিস থাকল, যাতে ওরা স্বাধীন কিন্তু সামাজিক ভাবে বেড়ে উঠতে পারে!

বাচ্চাকে ডিসিপ্লিন শেখাবেন যেভাবে/ How to discipline children in Bangla

#1. ওকে হাতে ধরে শেখান

শুধু নির্দেশ দেওয়ার চেয়ে হাতে ধরে শেখালে তার ফল যে ভালো হবে, এ আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে কি? “ওটা এভাবে নয় ওভাবে ধরো” অথবা “এটা এইভাবে ধরে খেতে হয়”, এই কথাগুলো শুধু মুখে না বলে আপনি যদি ওকে হাতে হাতে দেখিয়ে দেন দেখবেন এটা ও অনেক বেশি মনে রেখেছে। কখনও হয়তো দেখবেন, জেদ থেকেই মারধর করছে ও। হাত তুলছে বাড়ির কুকুর ছানাটার গায়ে। বকাঝকা না করে ওকে বোঝান। বলুন যে, এভাবে মারলে লাগতে পারে। বাড়ির কুকুর ছানাটিকে বিস্কুট, রুটি খেতে দিন ওর হাত দিয়ে। এতে ওর মনের পরিবর্তন হতে বাধ্য।

#2. ব্যবহারে বাড়াবাড়ি দেখলে সরিয়ে আনুন

যখন কোনও কিছু দিয়েই বাচ্চাকে শান্ত করতে পারবেন না, তখন সেই পরিস্থিতি থেকেই সরিয়ে আনুন ওকে। যেমন ধরুন, কোনও দোকানে বা শপিং মলে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু কিনতে চাইছে ও। যতই যাই বলুন, জেদ কমছে না কিছুতেই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে ওই জায়গা থেকেই সরিয়ে নিন। আপনার এই পদক্ষেপেই ও বুঝতে পারবে, বেশি জেদ করলে জিনিসটা তো পাওয়া যাবেই না। উল্টে তার থেকে আরও দূরে সরে যাবে ও!

#3. ভালো কিছুর প্রশংসা করুন মন খুলে

একটু প্রশংসা পেলে খুব আনন্দ পায় ছোটরা। খারাপ কাজে ওকে শাসন করে যতটা না বোঝাতে পারবেন, তার চেয়ে ঢের বেশি কাজ হবে কোনও ভালো কাজে মন খুলে প্রশংসা করলে! খেলার পর খেলনাগুলো ঠিক করে গুছিয়ে রাখা, পরিষ্কার করে খাওয়া, জামাকাপড় ঠিক ভাবে পরতে শেখা- এসবের জন্য ওর সামনেই ওর প্রশংসা করুন। দেখবেন, ও মনে মনে বেশ উৎসাহ পাচ্ছে। পরবর্তীতেও কাজটা ঠিক ভাবে করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

#4. মাঝে মাঝে না দেখার ভানও অনেকটা কাজে দেয়

মায়ের মনোযোগ, মায়ের আদর পাওয়ার জন্য এই বয়সি বাচ্চারা যে একটু বেশিই ঘ্যানঘ্যান করবে, এ আর নতুন কী! সব কিছুই ঠিকঠাক আছে, তা-ও দেখবেন আপনার বাচ্চাটি অকারণেই নাকে কাঁদছে, রাগারাগি করছে, আহ্লাদ করার চেষ্টা করছে। এসব ওর বেয়াদপি ভাববেন না, এসব স্রেফ ঢং। আপনার কাছে আসার বাহানা! বিষয়টি বুঝতে পারলে পুরোপুরি ইগনোর করুন। হয়তো খুবই কঠিন শোনাচ্ছে আমায়, কিন্তু আপনার শিশুর জন্যই এটা দরকার। ওর আহ্লাদকে বেশি প্রশ্রয় দিলে আগামীতে ভুগতে হবে ওকেই!

#5. কিছু সময়ের জন্য শিশু থাক ‘সময় বন্দি’

শিশুর ভিতর শৃঙ্খলাবোধ আনতে মায়েরা এই কৌশল ব্যবহার করছেন যুগ যুগ ধরে। এক-এক দেশে, এক-এক নাম এর। কিন্তু ধরনে নেই কোনও বদল। বাঙালির ঘরে যাহা ‘সময় বন্দি’, পশ্চিমী সংসারে তাহাই ‘টাইম আউট’। ধমক-ধামক না দিয়ে দুরন্ত বাচ্চাকে বাগে আনতে এটাই মায়েদের মস্ত হাতিয়ার। আপনিও এর সাহায্য নিতে পারেন। দুষ্টু করলে বাড়িরই একটা ঘরে কিছু সময়ের জন্য আটকে দিন ওকে। কিন্তু, সাবধান! সে ঘরে এমন কিছু যাতে না থাকে যা থেকে ক্ষতি হতে পারে শিশুর! এই ‘সময় বন্দি’ করার একটা নিয়মও আছে। বাচ্চার যত বয়স, তত মিনিট আটকে রাখুন ওকে। কাজ হবে তাতেই।

এতো গেল শিশুকে বাগে আনার, নিয়ম শেখানোর কৌশল। কিন্তু জানেন কি, ওর ভিতর নিয়মানুবর্তিতার শিকড় তৈরি হবে তখনই, যদি মা-বাবা হিসেবে আপনারাও কিছু নিয়ম, শৃঙ্খলা মেনে চলেন। শিশুর বেয়াদপির পিছনে মা-বাবারণ সঠিক আচরণের গাফিলতিও দায়ী হয়ে ওঠে অনেক সময়। নীচে রইল কিছু টিপস, যাতে সেই ভুলগুলো আপনি বা আপনার সঙ্গী না করে বসেন! How to discipline children in Bangla.

আরও পড়ুনঅটিজম কী, কেন? লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়

শিশুকে শৃঙ্খলা শেখাবেন কীভাবে/ How To Teach Your Children Good Personal Discipline

  • মনে রাখবেন, শিশুরা সবসময় মা-বাবাকেই অনুসরণ করে। সন্তানের জন্য যা নিয়ম করবেন, আপনি নিজেও তা মেনে চলুন। আপনি যদি সময়ে-অসময়ে টিভি চালিয়ে রাখেন কিংবা ফোনে গল্প করতে থাকেন বা ইন্টারনেট চালান, তা হলে আপনার সন্তানও নিয়ম মেনে কিছুই করবে না। সময়ের কাজ সময়ে করুন, সন্তান আপনাকে দেখেই শিখবে।
  • অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয় যে বাচ্চাকে বকাবকি নিয়ে ঝগড়া বেঁধে গেল মা-বাবার মধ্যেই। এটা কিন্তু খুবই খারাপ প্রবণতা। সন্তানকে শাসন করার সময় মা-বাবা একটা ইউনিট হিসেবে কাজ করুন। একজন বকলেন, অন্যজন কোলে নিয়ে আদর করে দিলেন, এমনটায় কোনও কাজই হয় না। শিশুকে বোঝান, ভুল করলে রাগ করবে মা-বাবা দু’জনই!
  • আপনার বাচ্চাটি যতই খুদে হোক না কেন, ওকে সম্মান করুন। ওর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করুন। মতামত না মানার মতো হলে বুঝিয়ে বলুন, কেন সেটা শুনছেন না আপনারা।
  • সন্তানকে শাসন করার সময় কখনও কোনও খারাপ কথার প্রয়োগ করবেন না। মা-বাবা, আপনাদেরও বলছি, নিজেরাও ঝগড়ার সময় কোনও খারাপ কথা মুখে আনবেন না। মাথায় রাখবেন, আপনি যা বলছেন, তাই শিখবে আপনার শিশু!
  • আরও একটা কথা। অন্য় কারও সাথে কখনও নিজের সন্তানের তুলনা করবেন না। সবার সামনে ওর সমালোচনাও করবেন না। এতে আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই শিশু মা-বাবার প্রতি আস্থাও হারাতে শুরু করে। তখন সামাজিক বোধের বিকাশ ঘটা তো দূর, আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে ও।
  • শৃঙ্খলাবোধ কখনও চাপিয়ে দেওয়া যায় না। প্রত্যেক শিশুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। ওর মন বুঝে তবেই দিনের রুটিন তৈরি করুন। আপনার শিশু কীভাবে সময় কাটাতে ভালোবাসে, কোন সময় পড়তে স্বচ্ছন্দ বোধ করে, এগুলো মাথায় রেখে তবেই রুটিন বেঁধে দিন।
  • কোনও কিছু অপছন্দ হলে সপাটে চড় বসিয়ে দিলেন গালে! এই প্রবণতা কিন্তু কমাতেই হবে আপনাকে। জানবেন, মারধরে কোনও কাজই হয় না। বাচ্চার কোনও আচরণে আপত্তি হলে ওর সঙ্গে কথা বন্ধ করুন, বুঝিয়ে বলুন, দেখুন ঠিক কাজ হবে। ওকে ক্ষমা চাইতে দিন!

এরই পাশাপাশি বলছি, যতই ব্যস্ততা থাক না কেন, সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিন। পরিবারের সক্কলে দিনের একটা সময় অন্তত একসঙ্গে কাটান। মা-বাবা, আপনারা নিজের ছোটবেলার গপ্পো শোনান ওকে। মনে রাখবেন, বেড়ে ওঠার দিনগুলোয় আপনার বাচ্চা একটু-আধটু দুষ্টুমি করবেই। ওর উপর শৃঙ্খলার ভার চাপাতে গিয়ে যেন কোনও ভুল না হয়ে যায়! এতে আপনার শিশুরই বিকাশ ব্যাহত হবে।
শিশু বুঝুক, মাঝেসাঝে বেড়া ভাঙতেও যে মজা হয় বেজায়…

একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

null

null