ঘরোয়া খাবারে বাড়িতে তুলুন একরত্তির খিদে। হদিস রয়েছে আপনার রান্নাঘরেই!

ঘরোয়া খাবারে বাড়িতে তুলুন একরত্তির খিদে। হদিস রয়েছে আপনার রান্নাঘরেই!

সৃষ্টি আর রোহনের একমাত্র ছেলে পিক্লু। বয়স মোটে ৩ বছর। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করে বলে পিক্লু সারাদিন ওর ন্যানির কাছে থাকে। পিক্লু ভীষণ শান্ত ও বাধ্য একটা পুঁচকে। তবুও কিন্তু রোজ সকালে আর রাতে ওদের এই ছোট্ট সংসারে একটা ছোটখাটো যুদ্ধ চলে। (Foods to Increase Child’s Appetite)

যুদ্ধের কারণ? পিক্লুবাবুকে খাওয়ানো নিয়ে। অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সৃষ্টি ছেলেকে আদর করে একটু খাইয়ে দিতে চায়, কিন্তু ২-৩ সপ্তাহ হল, খাবার দেখলেই পিক্লু হয় খাটের তলায় লুকিয়ে পড়ে, না হলে সারা বাড়ি চরকির মতো ঘুরতে শুরু করে, আর মা ধরে ফেললে তুমুল কান্না।

নানারকম খাবার বানিয়ে দেওয়া, এদিক ওদিক রেসিপি ঘেঁটে বাচ্চার মনের মতো কিছু করে দেওয়ার হাজার চেষ্টা করলেও ছেলের যেন মন ভরে না (Ways to Increase a Toddler’s Appetite)। ফিঙ্গার ফুড বানিয়ে দিলে ছেলে সেগুলো থালায় সাজিয়ে ছবি আঁকে; মা খাবার মুখে পুরে দিলে ২-৩ গ্রাস খেয়ে মুখ বন্ধ করে বসে থাকে বা মুখ থেকে খাবার ফেলে দেয়।

পিক্লুর ন্যানিরও এক অভিযোগ যে, ও ২-৩ গ্রাসের বেশি কিছুতেই খেতে চায় না। অথচ, আগে তো এমন ছিল না ছেলেটা। খিদে একদম কমে গেছে, হঠাৎ করে আর খাবারে যেন রুচিই নেই। পিক্লুকে খাওয়াতে গিয়ে সৃষ্টি আজকাল কাঁদতে বাকি রাখে। (Loss of Appetite in Children)

মা-বাবার মন আর কতক্ষণ দুশ্চিন্তা না করে থাকে! এই বাড়ন্ত বয়সে যে পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রয়োজন, একথা সৃষ্টি আর রোহন বেশ জানে। তাই আর দেরি না করে ওরা পিক্লুকে নিয়ে গেল শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে।

সব শুনে উনি জানালেন, পিক্লুর অ্যাপেটাইট বা চলতি কথায় খিদে পাওয়া কমে গেছে। তাই ও খেতে চাইছে না। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই খিদে কমে যাওয়া বা খাবারে অনীহা ভীষণ সাধারণ একটা সমস্যা। পরিচিত ডাক্তারবাবু পিক্লুর মা বাবাকে বলে দিলেন কয়েকটা ঘরোয়া উপায়। (Tips to Increase Your Child’s Appetite) সব রোগের সমাধানে তো প্রথমেই ওষুধের প্রয়োজন হয় না। তাই না?

আমরা ডাক্তারবাবু ও পিক্লুর বাবা-মায়ের আলোচনা তুলে ধরলাম প্রতিবেদনের মাধ্যমে। উদ্দেশ্য একটাই, যদি আপনার সন্তানও খেতে চাইছে না বা খিদের ইচ্ছে একেবারেই নেই, তা হলে সাহায্য করতে পারবো আপনাকে। বাড়ন্ত বয়সে সার্বিক পুষ্টির জন্য সময়ে সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে খাওয়াটা কিন্তু খুব জরুরি। কীভাবে বাচ্চার খিদে বাড়াবেন দেখে নিন একনজরে (How to Increase Appetite in a Child)।

 

বাচ্চার খিদে কমে যাওয়ার পিছনে যে যে সম্ভাব্য কারণগুলি থাকতে পারে (Loss Of Appetite In Children: Why Does It Happen)

  • অসুস্থতার কারণে খাবারে রুচি চলে যাওয়া।
  • কোনও বাহ্যিক কারণে বা পরিবেশ বদলের কারণে শিশুমনে প্রভাব পড়া এবং স্ট্রেসের উৎপত্তি।
  • কোনও ওষুধের প্রভাব।
  • মোবাইল ফোন বা টিভির ওপর বেশি আকর্ষণ। এর জন্য শিশু সারাদিন ঘরেই বসে থাকতে চায় এবং শারীরিক কোনও অ্যাকটিভিটি থাকে না। শারীরিক পরিশ্রম না হওয়ার দরুন বাচ্চার খাবার হজম হতে চায় না এবং খিদে কমে যায়।
  • বাচ্চা একটু নাদুসনুদুস হলে এবং নিজের চেহারা সম্পর্কে কোনও ভাবে সচেতন হয়ে গেলে সে ওজন বাড়ার ভয়ে খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। যেসব বাচ্চারা স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, তাদের ক্ষেত্রে এই
  • প্রবণতা বিশেষ দেখা যায়। বন্ধুদের দেওয়া “গোলু” বা “মোটা” বিশেষণ খুব বাজে প্রভাব ফেলে ছোট্ট মনে। (Common Causes of Loss of Appetite in Kids)
  • বাচ্চা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগলে।
  • ঘুরতে ফিরতে খাওয়ার অভ্যেস খুব বেশি হয়ে গেলেও এই সমস্যা হতে পারে। বাচ্চা নিজে খাওয়ার সময় একবার খেয়ে আবার আপনার পাত থেকে কিছু খেয়ে নিল। বাড়ির যে যখন যা খাচ্ছে, সে একটু করে নিজের ভাগের খাবার খাইয়ে দিচ্ছে বা বাচ্চা বাজারের কেনা ফ্রুট জ্যুসে চুমুক দিচ্ছে যখন তখন। এরকম করলে কিন্তু খিদে মরে যায়। (Loss Of Appetite In Toddlers) বাচ্চার ক্ষেত্রে তার সব খাবারেরই একটা নির্দিষ্ট সময় থাকা প্রয়োজন।

 

আরও পড়ুন: ডিমকে কেন শিশুর খাদ্যতালিকায় অবশ্যই রাখবেন, রইলো তারই বিশদ আলোচনা!

 

বাচ্চার অ্যাপেটাইট বা খিদে ঠিক রাখতে আপনি যা করতে পারেন? (How to Increase Appetite in a Child)

  • প্রাতরাশ করতেই হবে: কোনও ভাবেই প্রাতরাশ যেন মিস না হয়। ঠিক সময়ে ভালো ব্রেকফাস্ট কিন্তু হজম ক্ষমতা বাড়ায়। তাই বাচ্চার ব্রেকফাস্ট হোক সঠিক সময়ে ও পুষ্টিতে ভরপুর। কম সময়ে বানানো যায় অথচ পুষ্টিতে ভরপুর এমন কিছু প্রাতরাশের রেসিপি দিলাম এখানে-> ৫টি সুস্বাদু রেসিপি বাচ্চার জলখাবারের জন্য!

 

  • ভারী খাবার খাওয়ানোর আধ ঘণ্টা আগে জল: ভারী খাবার বা মিল খাওয়ার আধ ঘণ্টা আগে বাচ্চাকে জল খাওয়ান।

 

  • জোর দিন স্ন্যক্স-টাইমে: ভারী খাবার দিনে দুবার খেলেও মাঝে ২-৩ বার হালকা এবং স্বাস্থ্যকর টিফিন দিন বাচ্চাকে। এতে মেটাবলিজম বাড়ে, হজম ভালো হয় এবং খিদেও বাড়ে।

 

  • পর্যাপ্ত জিঙ্ক ও আয়রন রাখুন খাদ্যতালিকায়: বাচ্চার খাবারে যেন জিঙ্ক ও আয়রনের মতো পরিপোষক পর্যাপ্ত থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। পালংশাক, ডিম, ডাল, মুরগির মাংস, দই, সাইট্রাস ফল থাকুক ওর খাদ্যতালিকায়। শরীরকে আয়রন শোষণে সাহায্য করে ভিটামিন সি। তাই ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখতে ভুলবেন না।

 

  • খাবার বা মিল হিসেবে শুধু দুধ দেবেন না: টিফিন বা স্ন্যাক্স হিসেবে দুধ খেয়ে যেন পেট না ভরায় খুদে। দুধ দিন অন্য খাবারের সাথে মিলিয়ে। বাড়ন্ত বাচ্চার ক্ষেত্রে, শুধু দুধকে ভারী খাবার হিসেবে ধরবেন না। (How to Boost Toddler’s Weak Appetite)

 

  • নজর রাখুন শারীরিক পরিশ্রমে: বাচ্চাকে নিয়মিত একটু হলেও শরীর চর্চা করান, খেলতে নিয়ে যান। ইনডোর গেম বা টিভি নিয়ে যেন ব্যস্ত না হয়ে পড়ে সে। শারীরিক পরিশ্রম কিন্তু হজমক্ষমতা ও পাচনক্রিয়া ঠিক রাখে।

 

  • বাচ্চার মন বুঝুন: বাচ্চা যদি আচমকা খেতে না চায় তা হলে কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। বাচ্চার মনে কিছু চলছে কি না বা সে কোনও কারণে উদ্বেগে ভুগছে কি না, সেটা খেয়াল করুন। সেরকম হলে বাচ্চাকে শান্ত করুন।

 

  • বানিয়ে দিন প্রিয় খাবার: বাচ্চাকে রান্নাঘরে খাবার তৈরি করা দেখান এবং ওকে আপনাকে হেল্প করতে বলুন। মাঝে মাঝে বানিয়ে দিন ওর প্রিয় খাবার এবং সাজিয়ে দিন মজাদার করে। এতে খাবারের প্রতি ওর আকর্ষণ বাড়বে।

 

  • সবসময় জোর করবেন না: সবসময় জোর করে, মুখে গুঁজে বা ধমকে খাবার খাওয়াবেন না। এতে খাবারের ওপর অকারণ ভীতি চলে আসে।

 


বাচ্চার খিদে বাড়ানোর কিছু কার্যকরী টোটকা (Appetite Increase Remedy for Babies or Toddlers and Kids)

  • চীনাবাদাম: চীনাবাদাম মেটাবলিজম বাড়ায়। খাবার দ্রুত হজম হয় বলে বাচ্চার খিদেও পায়।

 

  • স্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স: উল্টোপাল্টা খাবারে পেট না ভরিয়ে বাচ্চা খেতে পারে বেদানা, আভকাডোর মতো ফল বা পিনাট বাটার/আমন্ড বাটার দেওয়া স্যান্ডউইচ। (Natural Appetite Stimulant for Toddlers)

 

  • কুমড়ো বীজ, মুরগির মাংস: এইসব খাবারে জিঙ্কের পরিমাণ পর্যাপ্ত হওয়ায়, বাচ্চার খিদে বাড়াতে খুব কার্যকর।

 

  • দই, পুদিনাপাতা: বাচ্চার খিদে বাড়াতে দইয়ের কিন্তু জবাব নেই। দই এবং অন্যান্য প্রবায়টিক খাবারে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম, উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ভিটামিন বি থাকে; যা বাচ্চার খিদে বাড়াতে ও খাবার হজমে সাহায্য করে। আবার দইয়ের এই কাজ আরও সহজ করে দেয় পুদিনা পাতা। দই খেতে দেওয়ার আগে কয়েকটা পুদিনা পাতা হাতে ঘষে দইতে মিলিয়ে দিন দেখি! (Foods to Increase Your Child’s Appetite)

 

  • তুলসী পাতা ও আদা: তুলসী পাতা ও আদা নিয়মিত বাচ্চাকে খাওয়ালে শুধু যে সর্দি-কাশি পালায় তা নয়, বাচ্চার অরুচি বোধ কমে ও খিদে বাড়ে। তুলসী পাতা কাঁচাই চিবোতে দিন খান পাঁচেক করে। আর আদা মেলাতে পারেন স্যালাডে, স্যান্ডউইচে বা বাচ্চা-স্পেশ্যাল আদা চায়ে। হজম ক্ষমতা বাড়াতে এদের জুড়ি নেই।

 

  • জোয়ান: জোয়ান জল দিন বা পরোটায় ছড়িয়ে দিন জোয়ান। ইচ্ছে আপনার। কিন্তু খুদের খিদে বাড়বে তরতরিয়ে।

 

  • মেথির জল: রোজ মেথি ভেজা জল খাওয়াতে পারেন আপনার বাচ্চাকে।

 

  • চব্যনপ্রাশ: জানেন কি, চব্যনপ্রাশ নিয়মিত খেলে বাচ্চার খিদে বাড়তে বাধ্য? খেতেও দারুণ আবার এটা খেলে যদি বাচ্চার খিদে বাড়ে ও অরুচি মেটে; এর থেকে ভালো আর কী হয়! চব্যনপ্রাশ আপনি বাজার থেকেও কিনে আনতে পারেন আবার একদম ছোট্ট বাচ্চার জন্য বাড়ীতেও বানিয়ে নিতে পারেন। বাড়িতে বানাতে চাইলে রেসিপি দিলাম এখানে-> বাড়িতেই বানান চ্যবনপ্রাশ ও কফ সিরাপ, জেনে নিন উপকারিতাও

 

  • গাজরের রস: দেখা গেছে, খাওয়ার আধ ঘণ্টা আগে যদি বাচ্চাকে গাজরের রস খাওয়ানো হয়, তা হলেও তার খিদে বাড়ে। বাচ্চা শুধু গাজরের রস খেতে গিয়ে নাক তুললে ওতে একটু খাঁটি গুড় বা মধু মিশিয়ে দিন। (Home Remedies to Increase Hunger In Child)

 

বাচ্চার বয়স বুঝে টোটকা বা খাবার প্রয়োগ করুন। আদর করে গল্প করে বাচ্চাকে খাওয়ান (How to Increase Hunger in Child Naturally)। খাবার সময় মজার মজার গল্প বলুন। আমাদের পিক্লুর কী হয়েছিল জানেন? নতুন প্লে স্কুল টা তার এক্কেবারে পছন্দ হয়নি। আর মা, বাবা, ন্যানিকে অতক্ষণ না দেখে থাকার অভ্যেস করার চেষ্টা করতে গিয়ে মনে মনে গুমরে যাচ্ছিল বেচারা। আর এর প্রভাবেই খাবার ইচ্ছে এক্কেবারে চলে গিয়েছিল তার।

বাচ্চা মানুষ, নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারে না এরা। তাই ব্যবহারে কোনও রকম পরিবর্তন দেখলে সতর্ক হন। কয়েকদিন দেখুন, ঘরোয়া উপায়ে কাজ না হলে নিয়ে যান ডাক্তারবাবুর কাছে। নিজে নিজে কোনও খিদে বাড়ানোর ওষুধ কিনে আনবেন না। (Foods to Increase Your Child’s Appetite)

 

আরও পড়ুন: খাবারে ফাইবার মানে সোনার শরীর-মন তাজা! আপনার আদুরেকে ভালো রাখতে তাই কী কী খাওয়াবেন?

 

একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

 

null

null