বাচ্চার কোষ্ঠকাঠিন্য; কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

বাচ্চার কোষ্ঠকাঠিন্য; কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য! শুনে অবাক হলেন বুঝি? ঠিক এভাবেই, অনেক নতুন বাবা-মা বাচ্চাদের এই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাটি ঠিক সময়ে বুঝে উঠতে পারেন না। ফলস্বরূপ, বাচ্চার শারীরিক অস্বস্তি বাড়ে এবং সে খিটখিটে হয়ে ওঠে। বড়দের মতোই, বাচ্চাদেরও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয়। সঠিক সময়ে বাচ্চার খাবারে রদবদল করে, এই সমস্যার সমাধান করা যায়। সাধারণত দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুরা এই সমস্যায় বেশি ভুগলেও, ৬ মাস থেকে ১ বছর বয়সি বাচ্চারও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।(Constipation in babies; what to do, what not to do).

কী দেখে বুঝবেন বাচ্চার কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে (How will you understand)

    • বাচ্চা যদি সপ্তাহে তিনবারের কম মলত্যাগ করে।
    • মল খুব শক্ত হয়ে যায় এবং মলত্যাগের সময় ব্যথা হওয়ায় বাচ্চা কান্নাকাটি করে।
    • মলত্যাগ করতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় নেয়।
    • পেট ফুলে শক্ত হয়ে থাকে ও মাঝে মধ্যে ব্যথা হয়।
    • বাচ্চা খাবার খেতে চায় না ও ঘ্যানঘ্য়ানে হয়ে যায়।
    • ওজন কমে যাওয়া।
    • বমি বমি ভাব।
    • বাচ্চার মল ও গ্যাসে দুর্গন্ধ।

কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ (Causes of constipation in babies)

      • শিশুর শরীরে জলের ঘাটতি হলে বা ডিহাইড্রেশন হলে, মল শুকনো ও শক্ত হয়ে যায়। বাচ্চার কানে ইনফেকশন, সর্দিকাশি বা মুখে র‍্যাশ হলে বাচ্চা বুকের দুধ খেতে চায় না বা জল খেতে চায় না। এজন্য, শরীরে জলের পরিমাণ কমে গিয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
      • মায়ের দুধে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফ্যাট ও প্রোটিন থাকে, তাই বাচ্চা ঠিকমতো বুকের দুধ খেলে তার মলত্যাগের কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু যেসব বাচ্চারা প্যাকেটের দুধ খায়, সেই দুধে পর্যাপ্ত প্রোটিন বা ফ্যাট না থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয়।
      • ৬ মাসের পরে বাচ্চাদের আস্তে আস্তে সলিড খাবার দেওয়া শুরু হয়। এসময় যদি বাচ্চা আঁশজাতীয় খাবার না খায়, তা
      • হলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
        অনেক শিশুর খাবার হজম হতে দেরি হয় বা কিছু খাবার হজম হতেই চায় না। এক্ষেত্রেও শিশুর মলত্যাগে কষ্ট হয়।

কী করবেন (What to do)

      • বাচ্চার বয়স ৬ মাসের কম হলে তাকে বেশি পরিমাণে বুকের দুধ খাওয়ান। প্যাকেটের দুধ খেলে, তার পাউডার এবং জলের পরিমাণ যেন সঠিক অনুপাতে থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। বাচ্চার শরীরে যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
      • বাচ্চা পুরোপুরি বুকের দুধের ওপর নির্ভরশীল হলে মায়ের খাদ্যতালিকায় কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন।
      • আপনার বাচ্চা যদি সলিড খাবার খেতে শুরু করে, তা হলে তাকে আঁশযুক্ত খাবার বেশি করে খাওয়ান। এইসমস্ত খাবার মল নরম করতে সাহায্য করে। লাউ, মিষ্টি কুমড়ো, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে।
      • বাচ্চাকে নাশপাতি, আলুবোখরা, খেজুর, বিভিন্ন ফলের শরবত এবং ইসবগুলের ভুসির শরবত খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।
      • ৬ মাস বয়সের বেশি বাচ্চাদের বুকের দুধের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে সলিড খাবার খাওয়ান।
      • বাচ্চাকে সারাদিন শুইয়ে রাখবেন না বা বসেও থাকতে দেবেন না। ওর সাথে খেলা করুন।একদম ছোট বাচ্চার হাত-পা নাড়িয়ে খেলা করান বা পা দিয়ে সাইকেল চালানোর মতো করে একটু ব্যায়াম করিয়ে দিন।
      • বাচ্চা যদি হামাগুড়ি দিতে শুরু করে, তা হলে তাকে আরও হামাগুড়ি দেওয়ার জন্য উৎসাহ দিন। বাচ্চা আরও একটু বড় হলে, সে যেন দিনে অন্তত এক ঘণ্টা হাঁটাচলা বা খেলাধূলা করে, সেদিকে নজর রাখুন।
      • কোনও ওষুধ খাওয়ার জন্য বাচ্চার কোষ্ঠকাঠিন্য হচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখুন। সেরকম মনে হলে, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
      • বাচ্চারা সাধারণত মলত্যাগের সময় প্রাইভেসি পছন্দ করে। আপনার বাচ্চা যে জায়গায় মলত্যাগ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেরকম জায়গাতেই তাকে মলত্যাগ করান।
      • নির্দিষ্ট সময়ে মলত্যাগ করানোর অভ্যেস তৈরি করুন, বাচ্চা আস্তে আস্তে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
      • মলদ্বার সবসময় পরিচ্ছন্ন ও আর্দ্র রাখার চেষ্টা করুন। মলদ্বার খুব শুকিয়ে গেলে বাইরে দিকে সামান্য অ্যালোভেরা জেল লাগিয়ে দিতে পারেন।

কী করবেন না (What not to do)

      • বাচ্চাকে কখনওই মলত্যাগের জন্য অত্যধিক জোর করবেন না বা বকাবকি করবেন না। এটা যে একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, সেটা ওকে বুঝতে দিন।
      • ঘরোয়া পদ্ধতিতে বা খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন এনেও যদি বাচ্চার কোষ্ঠকাঠিন্য ঠিক না হয়, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। বাচ্চার ডাক্তার যদি সফটনার ব্যবহার করতে বলেন, একমাত্র তবেই তা ব্যবহার করুন।
      • কখনওই নিজে নিজে বাচ্চাকে ল্য়াক্সেটিভ দেবেন না বা ওষুধের ডোজ ঠিক করবেন না। ডাক্তার অনুমতি দিলে তবেই ল্য়াক্সেটিভ ব্যবহার করুন এবং তাঁর পরামর্শ মতোই চলুন।
      • শিশুর মলের সাথে রক্ত দেখতে পেলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
      • অনেকসময় খুব পাতলা মলও কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে হতে পারে; সেরকম বুঝলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

আপনার একরত্তির শারীরিক সমস্যা অবশ্যই আপনার দুশ্চিন্তার বিষয়, কিন্তু এতে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন এনে এবং শিশুর দৈনিক ক্রিয়াকলাপ নজরে রাখলে, এই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে দূরে থাকা যায়। ঘরোয়া উপায়ে কাজ না হলে,বা শিশু বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

null

null