খেলতে খেলতে বুদ্ধির বিকাশ

খেলতে খেলতে বুদ্ধির বিকাশ

সঠিক পুষ্টি, মনের শান্তি আর অনেকটা ঘুম। আমরা সক্কলেই জানি, বাচ্চার বিকাশে এই তিনটে জিনিস কতটা প্রয়োজন। কিন্তু যেটা জানি না, সেটা হলো এরই সঙ্গে দরকার গুচ্ছের খেলনাপাতি! শুনে অবাক হলেন তো। ভাবতেন বুঝি খেলনা শুধুই টাইম পাস, শিশুকে ব্য়স্ত রাখার কৌশল মাত্র। না, তা নয়। গবেষণা বলছে, কিছু কিছু খেলনাই শিশুর প্রারম্ভিক বছরগুলোতে তার বুদ্ধির বিকাশে অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। ঠিক করে বাছাই করে নিলেই হলো। Brain development toys for baby in Bengali.

কোন কোন খেলার মাধ্যমে বাচ্চার বুদ্ধির বিকাশ সম্ভব, তার একটা পরিষ্কার ধারণা আগে আপনাকে নিজেই করতে হবে। ওকে বুদ্ধিমান করতে গিয়ে মাথায় পাহাড়প্রমাণ বোঝা চাপিয়ে দেবেন না। ওর ক্ষমতা বুঝেই ধীরে ধীরে নানা ব্রেন বুস্টিং খেলনার সঙ্গে পরিচয় করান ওর। চেকলিস্ট ছকে দিচ্ছি আমরা। Take a look at these brain development toys for baby.

কোন বয়সে কোন খেলনা (Toys by age)

সদ্য়োজাত-দুই বছর (0-2 years)

এক্কেবারে ছোট বাচ্চাদের জন্য় একটু নরম, রঙিন আর বেশ আওয়াজ করা খেলনা কেনাই ভালো। শক্ত কিছু দেবেন না ওকে, এতে আঘাত লাগতে পারে ওর। সুতো বা জড়ানো কিছুও দেবেন না, অসাবধনতাবশত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। জন্মের প্রথম মাস থেকেই মজার মজার সব খেলনা দিতে পারেন বাচ্চাকে। দেখবেন যাতে সেগুলো ওর খাটের উপর ঝুলিয়ে রাখা যায়। এতে ওর আকর্ষণ বাড়বে। একরঙা খেলনা কেনারই চেষ্টা করুন। ওর মনোযোগ বাড়বে। মুখেভাত হয়ে গেলে পর খেলনার খানিক বদল আনাই যায়। এই সময়টায় শিশু কিছু ধরতে শিখে যায়। তাই ও হাতে ধরতে পারবে এমন কিছু দিন। আর একটু পর হামা দিতে শুরু করলে যে খেলনাগুলো গড়িয়ে যায়, তেমন কিছু কিনে আনুন। এতে ওই খেলনার পিছু নিতে শিখবে ও। এরপর মোটামুটি দুলে দুলে হাঁটবে যখন বাড়িতে নিয়ে আসুন রঙিন বই, ফোম বা প্লাস্টিকের খেলনা। খেয়াল রাখবেন খেলনার সাইজ যেন এমন হয় যেটা ওর মুখে ঢুকবে না। এই সময়টায় বাচ্চা যাই পায় মুখে পুরে নেয়। তাই সব কিছুই সাফ-সুতরো রাখুন।

তিন-ছয় বছর (3-6 years)

বয়স তিন হলো মানেই প্রি-স্কুলের তোড়জোড় শুরু। এর জন্য় কিন্তু প্রস্তুত থাকতে হবে আপনাকেই। বাচ্চার হাতে আঁকার খাতা, পেনসিল তুলে দিন। আঁকিবুকি করতে করতে অক্ষর পরিচয় হবে ওর। সেই সঙ্গে টেনে নেওয়া যায়, এমন গাড়ি কিনে দিতে পারেন ওকে। কিছু ছুড়ে দেওয়া বা পা দিয়ে ধাক্কা মারার শিক্ষার জন্য় এই বয়সটায় বাচ্চার হাতে তুলে দিন প্লাস্টিকের বল, বেলুন ইত্য়াদি। বয়স চার কী পাঁচ হলে ওর জন্য় বিল্ডিং বক্স কিংবা ক্লে মডেলিং কিট নিয়ে আসতে পারেন। এতে বাচ্চার সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বিকাশ হবে। একবার স্কুল চালু হয়ে গেলে তো কথাই নেই। নতুন বন্ধু, নতুন জগৎ। পাঁচ-ছয়ের কচিকাঁচাদের তাই নানান সৃজনশীল খেলনা কিনে দিন। বাজারে, অনলাইনে রঙিন লেগো সেট মিলবে। টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে বাড়ি, গাড়ি, এসব তৈরি করা যায় এসব দিয়ে। এরই সঙ্গে দিতে পারেন বোর্ড গেম, কিংবা কোনও পাজল। এতে ওর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটবে, সময়ও কাটবে বেশ। এ ছাড়াও অঙ্কে ওর আগ্রহ বাড়াতে কিনে দিতে পারেন সংখ্য়া গোনার নানা খেলনা। আবার এমনও কিছু খেলনা পাওয়া যায়, যেখানে শব্দ নিয়েও খেলতে পারবে বাচ্চারা। এই খেলনাগুলো ওকে আরও মেধাবী করে তোলে। ওর মনে রাখার ক্ষমতাও বাড়ে।

সাত বা তার বেশি (7+ years)

এই সময়টাই যে কোনও বাচ্চার জন্য় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। আগামীর জন্য় তৈরি হচ্ছে ও। তাই ওকে এমন কিছু খেলনা দিয়েই ব্য়স্ত রাখার চেষ্টা করুন, যেটা মাথা খাটিয়ে খেলতে হবে ওকে। যেমন দাবা, লুডো এসব খেলা শিখিয়ে দিন ওকে। বাড়িরই বড় কেউ ওর সঙ্গে খেলতে বলে এইসব খেলার প্রতি আগ্রহ তৈরি করুন ওর। ভেবেচিন্তে খেলতে খেলতে বাচ্চার বুদ্ধির বিকাশ হবে অতি দ্রুত। এ ছাড়াও শব্দ বা সংখ্য়া নিয়ে ওর খেলার উৎসাহ বাড়াতে ওর সঙ্গে শব্দছক মেলান, কিংবা সুদোকুর ধাঁধা সমাধান করুন। বুদ্ধির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য় এই বয়সের বাচ্চাদের সাইকেল কিনে দিতে পারেন। প্রথম প্রথম ওর সুবিধার জন্য় তিন চাকার কিনে দিন, চালাতে চালাতে দুই চাকাতেও অভ্য়েস হয়ে যাবে। বয়স আট পেরিয়ে গেলে ওকে ওর পছন্দমতো জিনিস কিনে দিন, যা নিয়ে ও অবসর কাটাতে পারে। যেমন দূরবীন কিংবা খেলার ব্য়াট-বল। এই সময়টায় গল্পের বইয়ের প্রতি ওর ঝোঁকও তৈরি করা প্রয়োজন। প্রথমে অ্য়াডভেঞ্চারজাতীয় বইগুলোই বেছে নিন ওর জন্য়। আপনি পড়ে শোনান, এতে আগ্রহ বাড়বে ওর। স্বয়ংক্রিয় খেলনা এড়িয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করুন। কেননা নিজে থেকে কিছু না করতে পারলে বাচ্চার কল্পনা শক্তির বিকাশ তেমন হয় না। এই সমস্য়া মেটাতে আর্কিটেকচর সেট, বার্বি সেট, কিচেন সেট, ডল হাউজ, বিভিন্ন পাজেল-এর সাহায্য় নিতে পারেন আপনি। যতটা সম্ভব, ভিডিও গেম কিংবা মোবাইল-ট্য়াব থেকেও দূরে রাখুন ওকে। Toys by age.

পাশাপাশি বাদ দিন ব্য়াটারি চালিত খেলনাও। কেননা এর থেকে যে আওয়াজ তৈরি হয়, তা বাচ্চার মস্তিষ্কে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। মনে রাখতে হবে যে শিশু খেলার সময় যে জিনিসটা শেখে, সেটাই তাকে পরিচালনা করে দীর্ঘদিন। খুব বেশি নড়াচড়া করে, এমন খেলনাও কিনে আনতে পারেন। এতে শিশু পরিশ্রম করতে শিখবে। তবে হ্য়াঁ, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খেলনা দেবে না। এতে ছোট থেকেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার একটা প্রবণতা তৈরি হবে ওর মধ্য়ে।

খেলনা কেনার আগে খেয়াল রাখুন (Things to remember before buying toys)

  • দেখতে আকর্ষণীয় আর মজাদার বলেই কিনে নিলেন, এমন করবেন না। প্য়াকেটের গায়ের লেবেলটি ভালো ভাবে পড়ে নিন। খেলনাটি আপনার শিশুর জন্য় উপযুক্ত কি না, এসব যাচাই করে তবেই কিনুন। প্য়াকেটের গায়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখা থাকে কোন খেলনা কাদের জন্য়। সেটা দেখতে ভুলবেন না।
  • প্লাস্টিকের কিছু কেনার আগে ভালো করে পরীক্ষা করে নিন। খেলনাটি ভাঙা হলে অজান্তেই আপনার বাচ্চা নিজেই নিজেকে আঘাত দিয়ে ফেলবে। তা ছাড়া খুব ছোট হলে প্লাস্টিক এড়িয়েই চলুন।
  • বাচ্চা যখন হামা দিতে শেখে, টালমাটাল পায়ে হাঁটতে শেখে, তখন সব কিছুই মুখে পুরে চেখে দেখার একটা প্রবণতা তৈরি হয় ওর মধ্য়ে। তাই খেলনার সাইজ নিয়ে সচেতন থাকুন। খেলনা ছোট হলে মুখে পুরে নিয়ে কোনও বিপত্তি ঘটাতে পারে একরত্তি।
  • খুব জোরে আওয়াজ হয়, এমন খেলনা না কেনাই ভালো। একটানা জোরে আওয়াজে ওর কানের কোনও ক্ষতি হতে পারে। তা ছাড়া এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যেতে পারে বাচ্চার মস্তিষ্কের উপরও।
  • বাচ্চা যখন খুবই ছোট, তখন শূন্য়ে ছুড়ে দেওয়াা যায় এমন কোনও খেলনা দেবেন না ওকে। খেলতে গিয়ে ওই খেলনার আঘাতে চোট পাবে ও। বাচ্চার বোধশক্তি তৈরি হলে তবেই এই ধরনের খেলনা দিন ওকে। এতে দূরত্বের একটা ধারণাও তৈরি হবে ওর।
  • অধিকাংশ বাচ্চাই এখন সফট টয়, কাপড়ের পুতুল, তুলোর পুতুল এসব নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। এগুলো সবসময় ভালো দোকান থেকেই কেনা উচিত। ময়লা হলে সেগুলো যেন ধোওয়া যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে আপনাকেই। পাশাপাশি দেখে নিন খেলনাগুলোর সেলাই ঠিকঠাক কি না কিংবা ভিতরে শক্ত কিছু রয়েছে কি না। অনেক সময় কারিগরদের বেখেয়ালে এই ধরনের পুতুলে সূঁচ থেকে যায়। তাই সতর্ক থাকুন।

একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

null

null