বাচ্চাকে খাঁটি ঘী খাওয়ানোর উপকারিতা; সঙ্গে থাকল বাড়িতেই ঘী বানানোর সহজ রেসিপি!

বাচ্চাকে খাঁটি ঘী খাওয়ানোর উপকারিতা; সঙ্গে থাকল বাড়িতেই ঘী বানানোর সহজ রেসিপি!

সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘী-এর উপকারিতা এখন মোটামুটি সকলেরই জানা! আধুনিক ডায়েটের ভাষায় অনেকেই এই ঘী-কে সুপারফুডের তকমা দিচ্ছেন। আর যদি সামগ্রিক স্বাস্থ্যরক্ষারই কথা বলেন, তবে এই ঘীয়ের গুণগান তো সেই প্রাচীন কাল থেকেই সমাদৃত। রান্নাবান্না, হোমযজ্ঞ থেকে রূপচর্চা— খাঁটি ঘীয়ের ব্যবহার সবেতেই, সবসময়ই। কারণ ভালো মানের, অর্গ্যানিক ঘী-ই হলো নানা রকম পুষ্টিগুণে ঠাসা। ঠিক এ কারণেই ইংরেজিতে ঘী-কে বলে ক্ল্যারিফায়েড বাটার। মানে, মাখনে থাকা ক্ষতিকারক উপাদানগুলোকে ছেঁকে নিলে যা পড়ে থাকে, তা-ই হলো, সুগন্ধী থকথকে ঘী। এর মধ্যেকার সমস্ত জরুরি ফ্যাটি অ্যাসিড হজমে সাহায্য করা থেকে শুরু করে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য ও আর্দ্রতা ধরে রাখার কাজ সবই করে। (Benefits of ghee for babies in Bengali, ghee-er upokarita, sishuke ghee keno deben, ghee bananor recipe, homemade ghee.Benefits of Ghee for Babies and Homemade Ghee Recipe in Bengali.)

তবে হ্যাঁ, বাজারচলতি ঘী-এর সাথে খাঁটি, অর্গ্যানিক ঘী-এর গুণাগুণ গুলিয়ে ফেললেই গণ্ডগোল! খাঁটি ঘী তৈরি হয় মাখন থেকে, খাঁটি গোরুর দুধের সর থেকে! এতে কৃত্রিম, রাসায়নিক কোনও উপাদানই থাকে না। আর বানানোও বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে একবাট্টি যদি কষ্ট করে তৈরি করে ফেলাই যায়, তবে নিশ্চিন্ত থাকা যায় অনেকদিন। কৌটোয় ভরে স্বাদ উপভোগ করুন দীর্ঘদিন…
নিশ্চিন্তে এ ঘী-এর স্বাদ আপনি ভাগ করে নিতে পারেন আপনার পুঁচকেটির সাথেও। আমরা জানি, বাইরের কিছুই ওর মুখে তুলে দিতে বড্ড ভয় হয় আপনার! এদিকে ঘী-মাখন খাইয়ে ওকে নাদুননুদুস করার বাসনাও প্রবল! তাই বলি, ঘী দিন, তবে বাড়িতে বানিয়ে (Homemade ghee)। রোজের খাবারে একটু ঘী-এর ছোঁয়াই বেড়ে ওঠার দিনগুলোয় সুস্থ-সবল রাখবে ওকে। আসুন, তবে দেখে নিই বাচ্চাকে খাঁটি ঘী খাওয়ানোর উপকারিতা ঠিক কী কী!

 

 

বাচ্চাকে ঘী খাওয়ানোর উপকারিতা (Benefits of Ghee for Babies)

 

#1. বাচ্চার স্বাস্থ্য রক্ষা (For Baby’s Health)

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ হওয়ায় খাঁটি ঘী-ই আপনার শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে। কথায় কথায় রোগ-ভোগ থেকে রক্ষা করবে ওকে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানগুলি নানা রকম সংক্রমণকেও দূরে রাখবে ওর শরীর থেকে। বাড়িতে তৈরি ঘী থেকে বাচ্চার শরীর স্নেহ-দ্রবণীয় (fat-soluble) ভিটামিন, যেমন ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে শোষণ করতে পারে। বলা বাহুল্য, শিশুর সার্বিক বিকাশ ও সুস্বাস্থ্যে এই ভিটামিনগুলি কত গুরুত্বপূর্ণ!

 

#2. মস্তিষ্কের সুষম বিকাশ (For Baby’s Brain)

শিশুর জন্মের পর প্রথম দুই বছর অবধি তার মস্তিষ্কের বিকাশ হয় সবচেয়ে দ্রুত। আর তাতে ৫০ শতাংশ ভূমিকাই থাকে ফ্য়াট অর্থাৎ স্নেহজাতীয় উপাদানের। ডিএইচএ (DHA or Docosahexaenoic acid) হলো তেমনই উপকারী স্নেহজাতীয় উপাদান, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে যা অপরিহার্য। খাঁটি ঘী এই ডিএইচএ’রই অন্যতম উৎস। তাই বলছি, শিশুর খাবারে নিয়মিত ঘী রাখুন! ঘী দিয়েই রোজের খাবার বানান ওর।

 

#3. মালিশের তেল (Use as a Massage Oil)

বাচ্চার রোজের মালিশে তেলের ব্যবহার শুনে অনেকেই হয়তো রে রে করে উঠবে! কিন্তু জানেন কি, এই ঘী-মালিশই আপনার সন্তানকে রক্ষা করতে পারে সর্দি-কাশি থেকে। নীরোগ, তকতকে রাখতে পারে আপনার সন্তানের নরম ত্বক। শীতের দিনে তো বটেই, ভরা গরমেও অল্পসল্প ঘী-মালিশ দিতে পারেন ওকে।

 

#4. সর্দি-কাশির নিরাময় (Treat Dry Cough)

খাঁটি ঘী-এর নানান উপকারিতার ভিতর অন্যতম হলো সর্দি-কাশির সাথে এর লড়াই করার ক্ষমতা। হালকা গরম ঘী-ই আপনার বাচ্চার খুসখুসে কাশি, গলা ব্যথা সারিয়ে দিতে পারে। অল্প আদা, গোলমরিচ দিয়ে গরম করে এক চামচে ঘী দিনে দু’বার বাচ্চাকে দিন। পাই পাই করে পালাবে ওর সর্দি-কাশির ধাত
আরও একটা উপায় আছে! আধ চা-চামচ ঘী-তে ক’টা লবঙ্গ গরম করে নিন। লবঙ্গ ফেলে ঘী আলাদা করে নিন। ঠান্ডা করে বাচ্চাকে খাওয়ান। ঘী খেয়েই সাথে সাথে কুসুম গরম জল খাইয়ে দিন ওকে। বুকে কফ থাকলে নিরাময় হবে নিমেষে।

 

আরও পড়ুনঃ প্যাকেটজাত আর নয়, ১-৩ বছরের খুদের জন্য বাড়িতেই বানিয়ে ফেলুন পুষ্টিকর, সুস্বাদু মুসলি!

 

#5. শক্তির উৎস (Energy Booster)

বেড়ে ওঠার দিনগুলোয় দিনভর চনমনে থাকতে অনেকটা শক্তির প্রয়োজন পড়ে শিশুর শরীরে। জন্মের সময় শিশুর যা ওজন, এক বছরে তা তিনগুণ হওয়া উচিত নিয়ম মেনে। এই ওজন-বৃদ্ধিতে আর শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে জাদুর মতো কাজ করে ঘী। শিশুর হামা দেওয়া , হাঁটা, দৌড়ানো সবের জন্যই তাই ঘী মাস্ট!

 

#6. হজমে সহজ (Easy To Digest)

অন্যান্য খাবারে যে স্নেহজাতীয় উপাদান থাকে, তার চেয়ে বাড়িতে তৈরি খাঁটি ঘী হজমে অনেক সহজ। আপনি হয়তো বাচ্চাকে এমন কিছু খাওয়াতে চাইছেন যাতে বাচ্চার পেট ভালো থাকবে আবার প্রয়োজনীয় এনার্জিও পাবে ও। বাড়িতে তৈরি ঘী আপনার সেই চাহিদাই মেটাবে। স্নেহজাতীয় উপাদানে ঠাসা খাঁটি ঘী হজমে খুবই সহজ! আর এর থেকে আপনার বাচ্চা সারাদিন চনমনে থাকার এনার্জিও পেয়ে যায়।

 

#7. বাড়-বৃদ্ধিতে সহায়ক (Required for growth)

স্নেহজাতীয় উপাদানের স্বাস্থ্যকর উৎস হওয়ায় খাঁটি ঘী-ই আপনার বাচ্চার বাড়-বৃদ্ধির সঠিক ছন্দ বজায় রাখতে পারে। তা বাদে ঘী-তে আছে ভিটামিন কে-টু, ক্য়ালসিয়াম তৈরিতে তার জুড়ি মেলা ভার। সাথে সাথে খাঁটি ঘী-ই ভিটামিন ডি-র উৎসও। বাচ্চার শরীরে ক্য়ালসিয়াম যাতে শোষণ হতে পারে, তা-ই নিশ্চিত করে এই ভিটামিন-ডি। এ ছাড়াও ঘী-তে থাকা ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তি প্রখর রাখে
এতো গেলো উপকারিতার সাতকাহন, এবার তবে জেনে নিন এই খাঁটি ঘী, ভালো ঘী আপনি বানাবেন কীভাবে।

 

 

ঘরেই ঘী বানাবেন যেভাবে (Homemade Ghee Recipe)

 

  • দুধ ফোটানোর পর ৩-৪ ঘণ্টা করে ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিন। এই সময় দুধে হাত দেবেন না।

 

  • দুধের ওপর রোজ যে সর পড়বে, সাবধানে তুলে সেটা এবার একটা বাটিতে জমিয়ে রাখুন। ফ্রিজারে রাখুন, সর টাটকা থাকবে।

 

  • ক’দিন এভাবে জমালেই বেশ অনেকটা সর জমাট বেঁধে যাবে। বাটিখানেক হলে সেগুলোকে ব্লেন্ডারে মিশিয়ে ফেলুন। সরের যে মিশ্রণটা তৈরি হলো, এর নাম বাটারমিল্ক। ইচ্ছে হলে এই বাটারমিল্ক আপনি নানা কাজে ব্যবহার করতে পারেন। তবে ঘী বানাতে হলে আরও কিছু ধাপের ভিতর দিয়ে যেতে হবে আপনাকে।

 

  • ঘী বানাতে হলে এবার একটি তলা ভারী পাত্র নিতে হবে আপনাকে। অল্প আঁচে সেটা বসিয়ে সরের মিশ্রণ ঢেলে দিন। জমাট বাঁধা সর এবার ধীরে ধীরে গলতে শুরু করবে। এসময়টা আপনাকে ক্রমাগত নাড়া দিতে হবে পাত্রে!

 

  • অল্প আঁচে এভাবে নাড়তে থাকলে খানিক পর সোনালি-রঙা তেলতেলে তরল পাত্রের উপর ভেসে উঠবে। এটিই আপনার বহু আকাঙ্ক্ষিত ঘী! রং পাল্টে এরপর বুদবুদ উঠতে থাকবে পাত্রে।

 

  • একটু খেয়াল করে নামিয়ে নিন। দেখবেন, যেন পুড়ে না যায়।

 

  • পরিষ্কার ছাঁকনি ব্যবহার করে এবার তরল ঘী আলাদা করে নিন।

 

  • বাকি অংশটাও ফেলনা নয়, হালকা মিষ্টি মিলিয়ে অন্য খাবারেও সেটা ব্যবহার করতে পারেন।

 

  • আলাদা করে রাখা ঘী ঠান্ডা হলে এবার পরিষ্কার একটা কৌটোয় ভরে ফেলুন। বেশ কিছুদিন রেখে রোজের খাবারে মিলিয়ে আপনার বাচ্চাকে খাওয়ান।

 

 

মনে রাখুন কিছু কথা (Things to keep in mind):

 

#1. কবে থেকে বাচ্চাকে দেবেন? (When can you start giving ghee to the baby?)
মোটামুটি সাত-আট মাসের হলেই জন্মগত ফ্য়াট ঝরতে শুরু করে শিশুর শরীর থেকে। মায়ের বুকের দুধও এ-সময় শিশুর শরীরের সবরকম চাহিদা আর মেটাতে পারে না। এই বয়সটাই তাই শিশুর খাবারে ঘী ঢুকিয়ে দেওয়ার উত্তম সময়। বাড়িতেই আপনার সন্তানের জন্য ঘী বানিয়ে ফেলুন, এই ঘী সহজে হজমও করতে পারবে ও। চটকানো, সেদ্ধ খাবারে ঘী মিশিয়ে বাচ্চাকে খাওয়ান। চেটেপুটে, পেট ভরে খাবে ও।

 

#2. বাচ্চাকে কতটা দেবেন? (Amount of Ghee for Your Baby) 
বাচ্চার স্বাস্থ্যের প্রশ্নে একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন, নিয়ম মেনে, পরিমাণমাফিক দিলে সব কিছুই ভালো। মাত্রাতিরিক্ত দিলে ভালো নয় কোনও কিছুই। ঘী-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রোজ রোজ এত্ত ঘী খাইয়ে দিয়ে যেচে পড়ে ওর হজম-ক্ষমতার সাড়ে সর্বনাশ করবেন না। আপনার বাচ্চার বয়স যদি এক বছর বা তার কম হয়, তবে দিনপ্রতি ২ টেবিল-চামচ ঘী-ই দিন ওকে। এর চেয়ে বেশি হলে ওরই স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে।

 

#3. বাড়ির ঘী বাচ্চার পছন্দ হচ্ছে কি না (How Your Baby Reacts to it)
বাচ্চাকে কিছু খাওয়ানোর ক্ষেত্রে তিন-দিনের নিয়মটা অনুসরণ করতে ভুলবেন না যেন। বাচ্চাকে যদি প্রথমবার ঘী দিচ্ছেন তবে এক্কেবারে অল্প পরিমাণে দিন, এবং অন্তত তিনদিন নজর রাখুন ওর ওপর। যদি দেখেন ওর কোনও অসুবিধা হচ্ছে না, অ্যালার্জির কোনও প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না তবেই ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ান।

 

#4. ঘী মানে শুধুই বাড়িতে তৈরি ঘী (Always Prefer Homemade Ghee)
আগেও বলেছি, এখনও বলেছি বাড়িতে তৈরি খাঁটি ঘী-এর সাথে কেনা ঘী গুলিয়ে ফেলবেন না কোনও ভাবেই। বাড়িতে তৈরি ঘী-ই স্নেহজাতীয় উপাদানের সবচেয়ে সেরা উৎস। এর অনেক স্বাস্থ্যগুণ আছে, এবং সে কারণেই আপনার বাচ্চার রোজের খাদ্য তালিকায় এর উপস্থিতি আবশ্যক। তবে হ্যাঁ, সীমিত রাখুন পরিমাণ!

 

আরও পড়ুনঃ ছোট্ট ছানার জন্য সহজ-স্বাস্থ্যকর ১০ ধারার খিচুড়ির রেসিপি!

 

একজন মা হয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান? মায়েদের কমিউনিটির একজন অংশীদার  হয়ে যান। এখানে ক্লিক করুন, আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

null

null